বৃহস্পতিবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০১১

৩২। আল্লাহর রসুল (দঃ) এর ক্রোধ

উৎস: Islam and Dajjal
আল্লাহর(Allah)সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি, মানব জাতির মুকুটমনি মোহাম্মাদ বিন আবদুল্লাহর (দঃ) জীবনী ও হাদীস পর্যালোচনা কোরলে দেখা যায় কখনও কখনও তিনি ক্রুদ্ধ হোয়েছেন। জীবনী লেখক ও মোহাদ্দেসরা বর্ণনা কোরেছেন যে তিনি যখন খুশী হোতেন বা তার সঙ্গী সাথীদের কোন সুসংবাদ দিতেন, তখন তার মুখের চেহারা উজ্জ্বল ও দীপ্ত হোয়ে যেতো। তারা একাধিকবার তার ঐ অবস্থার সাথে পূর্ণ চন্দ্রের তুলনা কোরেছেন। আসহাবদের মধ্যে যারা তার ঐ অবস্থা দেখেছেন তাদের অনেকে বোলেছেন যে পূর্ণচন্দ্রের দীপ্তি ও সে দীপ্তির কাছে ম্লান মনে হোয়েছে। যখন কোন কারণে রেগে গেছেন তখন তার পবিত্র মুখ লাল হোয়ে গেছে। প্রশ্ন হোচ্ছে রাগ, ক্রোধ, মানুষের আত্মার শত্রু। লোভ, হিংসা ইত্যাদি ষড়রিপুর এক রিপু হোচ্ছে ক্রোধ। তবে কি আল্লাহর(Allah)রসুল (দঃ) সব রিপু জয় কোরতে পারেননি (নাউজুবিল্লাহ)? যেখানে ওলি, দরবেশ, সাধু পুরুষেরাও কেউ কেউ ষড়রিপু জয় কোরতে পারেন সেখানে নবীদেরও নেতা মোহাম্মদ (দঃ) তা পারেননি তা অসম্ভব। আসল কথা এই যে তিনি কখনও ব্যক্তিগত কারণে রাগ করেননি। মক্কার মোশরেকরা তাকে যখন নিষ্ঠুর নির্যাতন কোরেছে, অপমান কোরছে, তার পবিত্র মাথার ওপর উটের নাড়িভুঁড়ি চাপিয়ে দিয়ে শ্বাসরুদ্ধ কোরে অট্টহাসি হেসেছে, তখন তিনি রাগেননি, হিমাদ্রির মত অটল থেকে তার ওপর স্রষ্টার দেয়া দায়িত্ব পালন কোরে গেছেন। যদি মনে করা হয় যে তার তখনকার অসহায় অবস্থার জন্য তিনি রাগ প্রকাশ করেননি তবে তা হবে ভুল। কারণ, পরে যখন তিনি বিজয়ীর বেশে মক্কায় ফিরলেন তখন ঐসব মোশরেক কোরায়েশরা তার সামনে অসহায় অপরাধী হোয়ে দাঁড়িয়ে; তার একটি ইঙ্গিতে তাদের প্রত্যেকের মাথা তখন মরুভূমির বালিতে গড়াগড়ি যেতো। তিনি যদি রিপু জয়ী না হোতেন, তবে তিনি সেদিন প্রতিশোধ গ্রহণ কোরতেন। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় সেদিন তিনি প্রত্যেক অত্যাচারীকে মাফ কোরে দিয়েছিলেন, তাকে ব্যক্তিগতভাবে নির্যাতন, অপমান করার সামান্যতম প্রতিশোধ তিনি শুধু সেদিন নয় কোনদিনই নেননি। তাহোলে সেই মহামানবই কি কারণে রেগে লাল হোয়ে গেছেন? কারণ আছে এবং অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত কারণ আছে।

আল্লাহ(Allah) তার রসুলকে (দঃ) যে দ্বীন অর্থাৎ মানুষ কিভাবে এই পৃথিবীতে থাকলে অন্যায়-অবিচার-অত্যাচার ও রক্তপাত না করে শান্তিতে থাকতে পারবে সেই ব্যবস্থা দিয়ে পাঠালেন, সেটা হলো ইসলাম(Islam)। এই নিয়ম-কানুন-ব্যবস্থা হলো কোরান অর্থাৎ কোরান হলো এই ব্যবস্থার সংবিধান এবং এই সংবিধানের ব্যাখ্যা হলো হাদীস। এখন কথা হলো শুধু সংবিধান দিয়েই কি সব হোয়ে গেলো? মানুষ যদি সে সংবিধান গ্রহণ না করে, সে জীবন-বিধান মতে তাদের পূর্ণ জীবন অর্থাৎ রাষ্ট্রীয়, অর্থনৈতিক, আইন-দণ্ডবিধি মোতাবেক জীবন-ধারা পরিচালনা না করে তবে অবশ্যই সংবিধান এবং ব্যবস্থা উভয়ই অর্থহীন। একটি দেশের নেতা, সেটা বাদশাই হউন বা প্রেসিডেন্ট-প্রধানমন্ত্রীই হউন না বা সে দেশের আইন সভাই (Parliament) হউক, যদি অতি সুন্দর একটি সংবিধান ও আইন-কানুন তৈরী করেন, কিন্তু যদি কোন কারণে সেটা গ্রহণ, প্রয়োগ এবং কার্যকরি না কোরতে পারেন তবে ঐ সংবিধানের, আইন-কানুনের আর কোন দাম, অর্থ থাকে কি? অবশ্যই থাকে না, যদি সে সংবিধান ও আইন-কানুন নিখুঁতও (Perfect) হয় তবুও থাকে না। কাজেই আল্লাহ(Allah) মানুষের জন্য জীবন-বিধান দিয়েই ক্ষান্ত হোলেন না, যার মাধ্যমে তিনি এই জীবন-ব্যবস্থা পাঠালেন, তার ওপরই এই দায়িত্বও দিলেন যে- তিনি যেন পৃথিবীর অন্য সমস্ত ব্যবস্থা-বিধান বাতিল এবং উচ্ছেদ কোরে এই সংবিধান ও ব্যবস্থা বলবৎ ও কার্যকর করেন। শুধু জীবন-ব্যবস্থা, দ্বীন দেওয়াটাই যে যথেষ্ট নয়, একে প্রতিষ্ঠা করাও যে আরও বেশী গুরুত্বপূর্ণ এই কথাকে জোর দেবার জন্য আল্লাহ(Allah) তার রসুলকে এই নির্দেশ দেয়ার সাথে সাথে নিজে তার সাক্ষী রইলেন (কোরান- সূরা আল-ফাতাহ ২৮)। তাহোলে দেখা যাচ্ছে যে দু'টো বিষয় দাঁড়াচ্ছে- একটা হলো সংবিধান (কোরান ও হাদীস); দ্বিতীয়টা হলো এ সংবিধান, আইন-কানুন কে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা। এটা অতি সাধারণ জ্ঞান যে ঐ বিরাট-বিশাল কাজ এক জীবনে করা অসম্ভব। কাজেই আল্লাহর(Allah)রসুলের (দঃ) পৃথিবী থেকে চোলে যাবার পর সেই মহান দায়িত্ব অর্পিত হলো তার গড়া জাতিটির ওপর, একথা পেছনে বোলে এসেছি এবং একথাও বোলে এসেছি যে এই কাজ করার মাধ্যম, প্রক্রিয়া আল্লাহ(Allah) স্থির ও মনোনীত কোরলেন সামরিক। তা না কোরে যদি তিনি যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে এ কাজ করার সিদ্ধান্ত নিতেন, তবে সর্বশ্রেষ্ঠ পুরস্কর এ দ্বীনে রাখা হতো তর্কবাগীশদের জন্য, যদি এই দ্বীনের মাহাত্ম্য বর্ণনা কোরে হতো, তবে রাখা হতো শিক্ষিত লোকদের জন্য, যদি বক্তৃতা কোরে হতো তবে রাখা হতো বাগ্মীদের জন্য, যদি পরোপকার, দরিদ্রসেবা, সমাজসেবা কোরে হতো, তবে রাখা হতো লোক-হিতৈষী সমাজ-সেবকদের জন্য, যদি আধ্যাত্মিক শক্তি বলে মানুষের হৃদয় জয় কোরে কেরামত দেখিয়ে হতো, তবে রাখা হতো সুফী-দরবেশদের জন্য। কিন্তু এদের কারুর জন্যই আল্লাহ(Allah) সেই সর্বশ্রেষ্ঠ পুরস্কর ও সম্মান, রাখেননি যে পুরস্কার ও সম্মান মরতবার জন্য নবীদের নেতা সর্বশ্রেষ্ঠ মানব বোলেছেন- "আমার ওপর নবুয়তের দায়িত্ব না থাকলে আমি জেহাদে নেমে শহীদ হোতাম।" আল্লাহ(Allah) অন্তত দু'টো কারণে উপরে উল্লেখিত প্রক্রিয়া গুলির কোনটাই মনোনীত না কোরে সামরিক প্রক্রিয়া মনোনীত কোরেছেন। একটা হোচ্ছে এই যে ঐ প্রক্রিয়ায় হাজার হাজার বছরেও সমস্ত পৃথিবীর মানুষকে এই দ্বীনের ভেতরে আনা যাবে না। এর প্রমাণ এই যে সামরিক প্রক্রিয়ার ৬০/৭০ বছরের মধ্যে প্রায় অর্দ্ধেক পৃথিবী আল্লাহর(Allah)আইনের শাসনের আওতায় এসেছিলো এবং ঐ প্রক্রিয়া ছেড়ে দেবার পর সাড়ে তেরশ বছরেও পৃথিবীর বিরাট অংশ আজও তার বাইরেই আছে। এই সাড়ে তেরশ বছরে যেটুকু অগ্রগতি হোয়েছে সেটুকুও হোয়েছে ছোট ছোট সংঘবদ্ধ যোদ্ধাদের সামরিক অভিযানের ফলে। দ্বিতীয় হোচ্ছে আল্লাহর(Allah)উদ্দেশ্য হোচ্ছে সামরিক প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রশক্তি অধিকার কোরে তার আইন কানুন প্রয়োগ ও কার্যকরী করা। ব্যক্তিকে বাধ্য করা নয়, ব্যক্তিকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দেয়া, কারণ, অন্যায়-অবিচার (সামাজিক, অর্থনৈতিক, আইন-কানুন, দণ্ডবিধি ইত্যাদি সর্ব প্রকার অবিচার) ও রক্তপাত বন্ধ কোরে মানব জীবনে প্রকৃত শান্তি আনতে গেলে শাস্তি ও পুরস্কারের শক্তি অর্থাৎ রাষ্ট্রশক্তি হাতে না থাকলে তা অসম্ভব।

ভৌগোলিক, ভাষাগত, বর্ণগত ইত্যাদি বিভেদমূলক যত বাধা আছে সব চুরমার কোরে সমগ্র পৃথিবীর মানুষকে এক মানবজাতিভূক্ত কোরে এক সংবিধানের অধীনে আনার মত বিরাট-বিশাল দায়িত্ব দিয়ে আল্লাহ(Allah) তার শ্রেষ্ঠ রসুলকে (দঃ) পৃথিবীতে পাঠালেন। অতবড় একটি কাজ করার যোগ্য একটি জাতিও তার রসুল (দঃ) সৃষ্টি কোরলেন। মনে রাখতে হবে তিনি শুধু একটি সামরিক বাহিনী সৃষ্টি কোরলেন না, তিনি একটি মৃত্যুভয়হীন দুর্দ্ধর্ষ অপরাজেয় জাতি সৃষ্টি কোরলেন। কিন্তু অমন একটি জাতি সৃষ্টি করাই এ বিশাল কাজের জন্য যথেষ্ট নয়, কারণ ঐ কাজকে নষ্ট কোরে দেয়ার জন্য ইবলিস তার সাঙ্গপাঙ্গদের নিয়ে আপ্রাণ, অবিরত কাজ কোরে যাচ্ছে। বিশ্বনবী (দঃ) সে সম্বন্ধে সর্বদা শংকিত ও সতর্ক থাকতেন। যখনই কোন মানুষকে এমন কোন কাজ কোরতে দেখতেন যে কাজ ঐ বিশাল উদ্দেশ্যকে ক্ষতিগ্রস্থ কোরতে পারে তখনই তিনি রেগে যেতেন। এ রাগ, এ ক্রোধ তার ব্যক্তিগত কারণে নয় তার ওপর আল্লাহর(Allah)দেয়া বিরাট দায়িত্ব পূরণ করার বাধার জন্য। কিছু ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে। সংঘবদ্ধভাবে কোন কাজ কোরতে গেলে সফলতার কয়েকটি শর্ত আছে। (ক) কী অর্জন কোরতে হবে, লক্ষ্য কি, সে সম্বন্ধে পরিষ্কার ধারনা অর্থাৎ আকীদা এবং এ ধারণা এবং লক্ষ্য কী সে সম্বন্ধে সকলের ঐক্যমত অর্থাৎ লক্ষ্য সম্বন্ধে কারুর দ্বিমত নেই। এতে ঐক্যমত না হোলে সংগঠন যত শক্তিশালীই হোক সফলতা আসবে না। (খ) ইস্পাতের মত ঐক্য। এটাকে ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। একটি সংগঠনই হোক, জাতিই হোক আর রাষ্ট্রই হোক, যদি তার মধ্যে ঐক্য না থাকে তবে উদ্দেশ্য অর্জন দূরে থাক, সেটার অস্তিত্বই বিপন্ন হবে। (গ) শৃংখলা। নিয়মানুবর্তিতা, শৃংখলা ও আনুগত্য ছাড়া কোন উদ্দেশ্য অর্জন সম্ভব নয়। নেতার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যদি সংগঠন একযোগে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজে ঝাঁপিয়ে না পড়ে, নেতার আদেশ নির্দেশের সঠিকতা সম্বন্ধে প্রশ্ন তোলে তবে সাফল্য আসবে না। (ঘ) সংগঠনের আদেশ নিষেধগুলি নিয়ে বাড়াবাড়ি করা। পেছনে বোলে এসেছি দুটো ভাগ, একটি হোচ্ছে দ্বীন নিজেই, অন্যটি হোচ্ছে ঐ দ্বীনকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা। যদি দ্বীনের মধ্যে কি আছে, দ্বীনের ব্যবস্থার মধ্যে কী সূক্ষ্ম তারতম্য আছে, বা দ্বীনের বিধান সমূহকে অতিরিক্ত ভাবে পালন কোরতে যাওয়ার চেষ্টা করা হয় তবে অবশ্যম্ভাবীরূপে ঐগুলি নিয়েই জাতি ব্যস্ত হোয়ে পড়বে, মাতামাতি কোরবে এবং দ্বীনকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ব্যাহত হবে, বা পরিত্যাক্ত হবে, ফলে দ্বীনই অর্থহীন হোয়ে যাবে। এই কঠিন সত্যের পটভূমিতে বিশ্বনবীর (দঃ) ক্রোধ পর্যালোচনা কোরলে দেখা যায়, উপরোক্ত বিষয়গুলি সম্বন্ধে যখনই কাউকে তিনি লংঘন কোরতে দেখেছেন তখনই তিনি রেগে লাল হোয়ে গেছেন। পক্ষান্তরে আজকের বিকৃত, বিপরীত আকীদায় আমরা যেসব ব্যাপারকে ভীষণ গুরুত্ব দেই সে সব ব্যাপারে তিনি বিন্দুমাত্র রাগ করেননি। একটা একটা কোরে উদাহরণ দিচ্ছি।

(ক) জাতির লক্ষ্য, আকীদা। একজন সাহাবা (রাঃ) একবার একটি সুন্দর নির্জন উপত্যকা দিয়ে যাচ্ছিলেন, যেখানে একটি মিষ্টি পানির ঝরণা প্রবাহিত হোচ্ছিল। জায়গাটা তার খুব পছন্দ হলো এবং তিনি বোললেন ‘আমার ইচ্ছে হোচ্ছে, লোকালয় ত্যাগ কোরে এইখানে পাহাড়ের গুহায় বাস করি'। এই কথা মহানবীর (দঃ) কাছে বলা হলে তিনি বোললেন, "না। তা কোরবেনা। কারণ, যারা আল্লাহর(Allah)রাস্তায় (জেহাদে) আছে তাদের প্রত্যেকের স্থান ঘরে বসে সত্তর বছর এবাদতের চেয়েও বহু উর্দ্ধে। তুমি কি চাও না যে আল্লাহ(Allah) তোমাকে মাফ কোরে জান্নাতে প্রবেশ করান? আল্লাহর(Allah)রাস্তায় সশস্ত্র সংগ্রাম কর। দুইবার উটের দুধ দোহনের মধ্যে যেটুকু সময়, এইটুকু সময়ও যে সশস্ত্র যুদ্ধ কোরবে তার জন্য জান্নাত সুনিশ্চিত (হাদীস- আবু হোরায়ারা (রাঃ) থেকে তিরমিযী)। আরেক দিন রসুলুল্লাহ (দঃ) বাহিনীসহ যুদ্ধে যাচ্ছিলেন। রাস্থায় একটা পাহাড়ে গুহা দেখা গেলো, যেটা গাছ গাছড়ায় সবুজ এবং পানি আছে। একজন সাহাবার (রাঃ) মনে আকাংখা উদয় হলো সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হোয়ে ওখানে থেকে যাবার জন্য (এবাদতের জন্য)। তিনি রসুলুল্লাহর (দঃ) কাছে এজন্য অনুমতি চাইলেন। রসুলুল্লাহ (দঃ) জবাব দিলেন নিশ্চয়ই আমাকে ইহুদী বা খ্রীস্টান ধর্ম দিয়ে পাঠানো হয়নি। আমাকে পাঠানো হয়েছে দ্বীনে হানিফা হানাফিয়াহ দিয়ে। যার হাতে মোহাম্মদের (দঃ) জীবন তার কসম, সকালে বা বিকেলে আল্লাহর(Allah)রাস্তায় মার্চ (চলা) সমস্ত পৃথিবী এবং এর মধ্যে যা কিছু আছে তার চেয়ে উত্তম এবং এই বাহিনীর তোমাদের যে কারুর স্থান (মরতবা) ষাট বছরের নামাযের চেয়ে উর্দ্ধে [হাদীস- আবু ওমামা(রাঃ) থেকে আহমদ মেশকাত]।

উভয় রাবীর বর্ণনা ও ভাষা প্রকাশ করে যে, জেহাদ ত্যাগ কোরে এবাদত রসুলাল্লাহ (দঃ) সমর্থন তো করেন নাই, জোর ভাষায় তা প্রত্যাখ্যান কোরেছেন। যদিও হাদীস দু'টিতে ঠিক মুখ লাল হোয়ে যাওয়া উল্লেখ নেই কিন্তু নিশ্চিতরূপে প্রত্যাখ্যান পরিষ্কার এবং "যার হাতে মোহাম্মদের প্রাণ তার কসম"এই বাক্য কোন বিষয়ের ওপর অত্যন্ত জোর দেয়া (Stress,Imphasis) এবং রাগ প্রকাশ ও উত্তেজনা বোঝায়। যেখানে মন বিক্ষিপ্ত হবে না নিবিষ্ট-চিত্তে বোসে এবাদত করা যাবে আল্লাহর(Allah)যিকর করা যাবে এমন জায়গায় থাকবার কথায় বিশ্বনবী (দঃ) এমন বাধা দেবেন কেন? এবং এমন জোরালো ভাষায় নিষেধ কোরবেন কেন? এই জন্য যে এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আল্লাহ(Allah) ও তার রসুল (দঃ) জাতির জন্য যে দিক-নির্দেশনা স্থির কোরেছেন ওটা তার ঠিক বিপরীত এবং তাদের প্রদর্শিত দিক নির্দেশনার বিপরীত দিকে চলার অর্থ যে এই পৃথিবীতেই অপমান, পরাজয় ও ধ্বংস এবং পরজগতে দুঃসহ শাস্তি একথা বলার অপেক্ষা রাখে না। ঐদিক নির্দেশনা পৃথিবীতে ইসলাম(Islam) প্রতিষ্ঠার সশস্ত্র সংগ্রামের এবং সে জন্যই মহানবী (দঃ) জানিয়ে দিলেন যে ঐ দিক-নির্দেশনা অর্থাৎ সশস্ত্র সংগ্রামের পথে এক বেলা পথ চলা সমস্ত পৃথিবী এবং তার মধ্যে যা কিছু আছে তার চেয়ে উত্তম এবং দু'বার উটের দুধ দোহনের সময়টুকুর জন্যও যে জেহাদ কোরবে তার জন্য সমস্ত গোনাহ মাফ এবং জান্নাত সুনিশ্চিত। কোথায় সত্তর বছরের নামায-এবাদত, আর কোথায় দুবার দুধ দোহনের সময় অর্থাৎ ঘন্টা চারেক।

(খ) জাতির ঐক্য। একটি জাতি একটি সংগঠন যত শক্তিশালীই হোক যত প্রচণ্ড শক্তিশালী অস্ত্র-শস্ত্র, ধন-সম্পদের অধিকারীই হোক যদি তাদের মধ্যে ঐক্য না থাকে তবে তারা কখনই জয়ী হোতে পারবে না। অতি দূর্বল শত্রুর কাছেও তারা পরাজিত হবে। তাই আল্লাহ(Allah) কোরানে বহুবার এই ঐক্য অটুট রাখার জন্য তাগিদ দিয়েছেন। এই ঐক্য যাতে না ভাঙ্গে সে জন্য তার রসুল (দঃ) সদা শংকিত ও জাগ্রত থেকেছেন এবং এমন কোন কাজ যখন কাউকে কোরতে দেখেছেন যাতে ঐক্য নষ্ট হবার সম্ভাবনা আছে তখন রেগে গেছেন। একদিন দুপুরে আব্দুল্লাহ বিন আমর (রাঃ) রসুলাল্লাহর গৃহে যেয়ে দেখেন তার মুখ মোবারক ক্রোধে লাল হোয়ে আছে। কারণ তিনি দু'জন আসহাবকে কোরানের একটি আয়াত নিয়ে মতবিরোধ কোরতে দেখতে পেয়েছিলেন। তিনি (দঃ) বোললেন- কোরানের আয়াতের অর্থ নিয়ে যে কোন রকম মতভেদ কুফর। নিশ্চয়ই তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিসমূহ (উম্মাহ) তাদের (ওপর অবতীর্ণ) কিতাব গুলির (আয়াতের) অর্থ নিয়ে মত বিরোধের জন্য ধ্বংস হোয়ে গেছে। তারপর তিনি আরও বোললেন (কোরানের) যে অংশ (পরিষ্কার) বোঝা যায় এবং ঐক্যমত আছে তা বল, যে গুলো বোঝা মুশকিল সেগুলোর অর্থ আল্লাহর(Allah)কাছে ছেড়ে দাও (মতবিরোধ কোরোনা) [হাদীস-আব্দুল্লাহ বিন আমর (রাঃ) থেকে- মুশলিম, মেশকাত]। বিশ্বনবী (দঃ) রেগে লাল হোয়েছিলেন কেন? কারণ যদিও তিনি পরিষ্কার বোলেই দিলেন অর্থাৎ আয়াতের অর্থ নিয়ে মতবিরোধ হোয়ে জাতির ঐক্য নষ্ট ও পরিণামে যে জন্য জাতির সৃষ্টি সেই সংগ্রামে শত্রুর কাছে পরাজয় ও পৃথিবীতে এই দ্বীনকে প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থতা। তবুও ইতিহাস এই যে, যে কাজকে রসুলাল্লাহ (দঃ) কুফর বোলে আখ্যায়িত কোরেছেন সেই কাজকে মহা সওয়াবের কাজ মনে কোরে করা হোয়েছে এবং হোচ্ছে অতি উৎসাহের সাথে এবং ফলে বিভিন্ন মযহাব ও ফেরকা সৃষ্টি হোয়ে জাতির ঐক্য নষ্ট হোয়ে গেছে এবং জাতির শত্রুর কাছে শুধু পরাজিতই হয়নি তাদের ক্রীতদাসে পরিণত হোয়েছে।

(গ) শৃংখলা

এটা সাধারণ জ্ঞান যে বিশৃংখল কোন জাতি বা কোন সংগঠন দিয়ে কোন কাজে সফলতা সম্ভব নয়। সমস্ত মানব জাতির ওপর আল্লাহর(Allah)আইন প্রতিষ্ঠার মত বিরাট কাজে তো নয়ই। এই জাতির চরিত্রের মধ্যে সেই শৃংখলা, আনুগত্য এবং নিয়মানুর্বতিতা শিক্ষার ব্যবস্থা আল্লাহ(Allah) ও তার রসুল (দঃ) কোরেছেন নামাযের মধ্য দিয়ে। তাই নামায সামরিক ড্রিল এবং কুচকাওয়াজের মত। শৃংখলার সাথে সকলে একতাবদ্ধ হোয়ে কাজ করার শিক্ষার প্রথম পদক্ষেপ হলো লাইন কোরে দাঁড়ানো এবং সেই লাইন যেন একটুকুও বাঁকা না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখা। এ ব্যাপারে পেছনে বোলে এসেছি। বোলে এসেছি বিশ্বনবী (দঃ) কি পরিমাণ জোর দিয়েছেন নামাযের লাইন নিখুঁতভাবে সোজা করার জন্য। যখনই লাইন সোজা করার কথা বোলেছেন তখনই জোর দেবার জন্য একাধিকবার বোলেছেন। অর্থাৎ সোজা কর, সোজা হও। অন্য সব হাদীস বাদ দিয়ে শুধু মেশকাতেই দেখি তিনি নামাযের লাইন নিখুঁত ভাবে সোজা হওয়ার কথা নয়টি বিভিন্ন হাদীসে বোলেছেন। এবং অত্যন্ত জোর দেবার জন্য বোলেছেন 'যার হাতে আমার জীবন তার কসম' [হাদীস -আনাস (রাঃ) থেকে আবু দাউদ মেশকাত]। নামাযের এই লাইন নিখুঁতভাবে সোজা করার গুরুত্ব থেকেই বোঝা যায় যে নামাযের বাকি কাজগুলি অর্থাৎ ইমামের হুকুমের (তকবির) সঙ্গে সঙ্গে বিনা দ্বিধায় কাজ করার শৃংখলা ও নিয়মানুবর্তিতার শিক্ষাও কতখানি গুরুত্বপূর্ণ। এই শৃংখলা ও নিয়মানুবর্তিতা ও আনুগত্যের শিক্ষার জন্যই মহানবী (দঃ) নির্দেশ দিয়েছেন যে একজন কানকাটা নিগ্রো ক্রীতদাসও যদি তোমাদের নেতা হয়, তবে বিনা প্রশ্নে বিনা দ্বিধায় তার আদেশ-নির্দেশ, নিষেধ পালন করবে [হাদীস- ইরবাদ বিন সারিয়াহ (রাঃ) থেকে আহমদ, আবু দাউদ ইবনে মাজাহ, তিরমিযি]।

(ঘ) দ্বীন নিয়ে বাড়াবাড়ি করা। আল্লাহ(Allah) যেমন তার কোরানে দ্বীন নিয়ে বাড়াবাড়ি করা নিষেধ কোরে দিয়েছেন, তার নবীও (দঃ) নিষেধ তো-কোরেছেনই, তার ওপর যখনই কোন বাড়াবাড়ি দেখেছেন তার আসহাবদের মধ্যে তখনই রেগে গেছেন। একদিন আল্লাহর(Allah)রসুলকে (দঃ) জানানো হলো যে কিছু আরব রোযা রাখা অবস্থায় স্ত্রীদের চুমা দেন না এবং রমযান মাসে সফরে বের হোলেও রোযা রাখেন। শুনে ক্রোধে বিশ্বনবীর (দঃ) মুখ-চোখ লাল হোয়ে গেলো এবং তিনি মসজিদে যেয়ে মিম্বরে দাঁড়িয়ে আল্লাহর(Allah)হামদ বলার পর বোললেন-সেই সব লোকদের কী দশা হবে যারা আমি নিজে যা করি তা থেকে তাদের বিরত রেখেছে? আল্লাহর(Allah)কসম তাদের চেয়ে আমি আল্লাহ(Allah)কে বেশী জানি এবং বেশী ভয় করি [হাদীস-আয়েশা (রাঃ) থেকে বোখারী, মুশলিম, মেশকাত]। একদিন একজন লোক এসে আল্লাহর(Allah)রসুলের (দঃ) কাছে অভিযোগ করলেন যে ওমুক লোক নামায লম্বা কোরে পড়ান কাজেই তার (পড়ানো) জামাতে আমি যোগ দিতে পারিনা। শুনে তিনি(দঃ) এত রাগান্বিত হোয়ে গেলেন যে -বর্ণনাকারী আবু মাসউদ (রাঃ) বোলছেন যে- আমরা তাকে এত রাগতে আর কখনও দেখিনি [হাদীস- আবু মসউদ (রাঃ) থেকে বোখারী]। অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কোন বিষয়ে মাসলাহ জানতে চাইলে বিশ্বনবী (দঃ) প্রথমে তা বোলে দিতেন। কিন্তু কেউ যদি আরও একটু খুঁটিয়ে জানতে চাইতো তাহোলেই তিনি রেগে যেতেন। কারণ তিনি জানতেন ঐ কাজ কোরেই অর্থাৎ ফতওয়াবাজী কোরেই তার আগের নবীদের জাতিগুলো ধ্বংস হোয়ে গেছে নিজেদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি কোরে। কিন্তু তার অত ক্রোধেও অত নিষেধেও কোন কাজ হয়নি। তার জাতিটিও ঠিক পূর্ববর্তী নবীদের (আঃ) জাতিগুলির মত দ্বীন নিয়ে অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি কোরে অতি মুসলিম(Muslim) হোয়ে মসলা-মাসায়েলের তর্ক তুলে বিভেদ সৃষ্টি কোরে হতবল, শক্তিহীন হোয়ে শত্রুর কাছে পরাজিত হোয়ে তাদের গোলামে পরিনত হোয়েছে।

একদিন একজন পথে পড়ে থাকা জিনিসপত্র কি করা হবে এ ব্যাপারে রসুলুল্লাহর (দঃ) কাছে মাসলাহ জিজ্ঞাসা করায় তিনি তার জবাব দিয়ে দিলেন। ঐ লোকটি যেই জিজ্ঞাসা করলেন যে যদি হারানো উট পাওয়া যায় তবে তার কি মাসলাহ? অমনি সেই জিতেন্দ্রিয় মহামানব এমন রেগে গেলেন যে তার পবিত্র মুখ লাল টকটকে হোয়ে গেলো [হাদীস-যায়েদ এবনে খালেদ জুহানী (রাঃ) থেকে বোখারী]। আরেকদিন একজন সাহাবা মহানবীকে (দঃ) কোন এক বিষয়ে প্রশ্ন কোরলেন এবং তিনি যথাযথ জবাব দিলেন। সাহাবা ঐ ব্যাপারে আরও একটু জানতে চাইলেন। এবারও বিশ্বনবী (দঃ) বুঝিয়ে দিলেন। এরপর ঐ সাহাবা যখন আরও একটু বিস্তৃতভাবে জানার জন্য প্রশ্ন কোরলেন ওমনি তিনি রাগে ফেটে পড়লেন, তার পবিত্র মুখমণ্ডল ক্রোধে লাল হোয়ে গেলো। বোললেন শোন! আমার পূর্ববর্তী নবীদের তাদের অনুসারীরা ঠিক এমনি কোরেই প্রশ্ন করতো এবং যে সব উত্তর পেতো তা নিয়ে গবেষণা-বিশ্লেষণ করতো যার ফলে তাদের মধ্যে মতভেদ হতো এবং পরিণামে তারা ধ্বংস হোয়ে যেতো। আমি তোমাদের যা কোরতে বলেছি ঐটুকুই কোরতে চেষ্টা করো, ওর বেশী কোরতে যেওনা, তাহোলে তাদের মতই ধ্বংস হোয়ে যাবে (হাদীস)।

কি ধরনের বিষয়ে আল্লাহর(Allah)রসুল (দঃ) রেগে যেতেন তা দেখা গেলো। এবার দেখা যাক কী ধরনের বিষয়ে তিনি রাগেননি ক্রোধান্বিতও হননি। (ক) ব্যাভিচার। এক যুবক একদিন রসুলুল্লাহর কাছে এসে বলল "আমি ইসলাম(Islam) গ্রহণ কোরতে চাই, কিন্তু আমি ব্যাভিচার (যেনা) থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারব না"। হাদীস বর্ণনাকরী বর্ণনা কোরছেন যে সেই মহামানব (দঃ) (রাগ তো কোরলেন নাই বরং) ঐ যুবককে স্নেহভরে নিকটে ডেকে বসিয়ে বোললেন তোমার মা, বোন, মেয়ের সাথে কেউ ব্যাভিচার কোরলে তুমি কি তা পছন্দ কোরবে? সেই যুবক রক্তাক্ত চোখে জবাব দিলো কেউ তা করার আগেই আমি তাকে দু'টুকরো কোরে কেটে ফেলবো।" মহানবী (দঃ) বোললেন "তাই যদি হয় তবে তুমি ভুলে যাচ্ছো কেন যে তুমি যার সাথে ব্যাভিচার কোরবে সেও তো কারো মা বা বোন বা মেয়ে (হাদীস- বোখারী)।" (খ) সহিহ হাদীসে বেশ কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ আছে যেখানে কোন লোক নিজেকে সংযত রাখতে না পেরে ব্যাভিচার কোরে ফেলেছেন। পরে শুধু অনুতপ্ত হোয়েই তারা ক্ষান্ত হননি, তারা আল্লাহর(Allah)দেয়া শাস্তি গ্রহণ কোরে পবিত্র হোতে চেয়েছে, তারা আল্লাহর(Allah)রসুলের (দঃ) কাছে এসে তাদের ব্যাভিচারের কথা প্রকাশ কোরে দিয়ে শাস্তি চেয়েছেন। ঐসব ঘটনায় বিশ্বনবী (দঃ) কী কোরেছেন তা লক্ষ্য করার বিষয়। কোন সামান্যতম রাগ করেননি বরং সমস্ত ব্যাপারটাকে এড়িয়ে যেতে চেষ্টা কোরেছেন। ভাবটা এই রকম যে তুমি অপরাধ কোরে ফেলেছো তো ফেলেছোই সেটা আবার প্রকাশ কোরতে এসেছো কেন? তুমি না বোললে তো কেউ জানবেই না যে তুমি কী কোরেছো। কাজেই ও গোপন ঘটনা গোপনই রাখো। শাস্তি পেতে কৃতসংকল্প সেই লোককে যখন তিনি কিছুতেই বিরত কোরতে পারেননি তখন তিনি তাকে উকিলের মত জেরা কোরেছেন, এই উদ্দেশ্যে যে যদি ঐ লোকের বর্ণনায় কোন খুঁত বের কোরতে পারেন তবে হয় শাস্তি দেবেন না বা লঘু শাস্তি দেবেন। উদাহরণ দিচ্ছি- একজন লোক মসজিদে (নববী) এসে বিশ্বনবীকে (দঃ) বোললেন ইয়া রসুলুল্লাহ! আমি ব্যাভিচার কোরেছি। কোন জবাব না দিয়ে মহানবী (দঃ) ঘুরে অন্যদিকে হোয়ে বোসলেন। ঐ লোকটি ঘুরে রসুলুল্লাহর (দঃ) সামনে যেয়ে আবার ঐ কথা বোললেন এবং তিনি কোন জবাব না দিয়ে আবার ঘুরে অন্যদিকে হোয়ে বোসলেন। চারবার ওমনি করার পর অর্থাৎ প্রকাশ্যে চারবার ব্যাভিচারের ঘোষণা দেবার পর আল্লাহর(Allah)রসুল (দঃ) তাকে বিধিবদ্ধ শাস্তির আদেশ দিলেন [হাদীস আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে বোখারী, মুসলীম, মেশকাত]। প্রকাশ্যে জনসমক্ষে চারবার ব্যাভিচারের স্বীকৃতি ঘোষণা না কোরলে মহানবী (দঃ) শাস্তির আদেশ দিতেন না। অনেক সময় প্রথম ঘোষণার পর অপরাধীকে ফেরৎ পাঠিয়ে দিতেন অনুতপ্ত হোয়ে আল্লাহর(Allah)কাছে মাফ চাইবার জন্য। চারবার ফেরৎ এসে স্বীকৃতি ঘোষণার পরও তাকে জেরা কোরতেন বর্ণনায় খুঁত ধরার জন্য [হাদীস- ইয়াযীদ বিন নুয়াইম (রাঃ) এবং আবু হোরায়রা (রাঃ)]। যখন কোন মানুষ মহানবীর (দঃ) দরবারে এসে অর্থাৎ প্রকাশ্য জনসমক্ষে সবাইকে শুনিয়ে রসুলু্লাহকে বলতেন যে তিনি ব্যাভিচার কোরেছেন শুধু তখনই আল্লাহর(Allah)নবী (দঃ) বুঝে যেতেন যে ঐ লোকটির লক্ষ্য অত্যন্ত উচ্চ। তিনি চাচ্ছেন যে তার অপরাধে, পদস্খলের শাস্তি এই দুনিয়াতেই হোয়ে যাক, যাতে তিনি পবিত্র হোয়ে পরজগতে প্রবেশ কোরতে পারেন, যেখানে ঐ অপরাধের জন্য আবার শাস্তি হবে না। কিন্তু তা জেনেও তিনি তার শাস্তি এড়িয়ে যাবার চেষ্টা কোরতেন। যখন দেখতেন যে ঐ লোক এই দুনিয়াতেই পবিত্র হবার জন্য এমন কৃতসংকল্প যে তিনি চার চারবার প্রকাশ্যে তার অপরাধের কথা ঘোষাণা কোরছেন শুধু তখন তিনি তাকে আল্লাহর(Allah)শরিয়াহ অর্থাৎ এই দণ্ডবিধি (Penal Code) মোতাবেক শাস্তির আদেশ দিতেন। একজন লোককে মদ খেয়ে মাতলামির জন্য শরাহ মোতাবেক শাস্তি দেয়া হলো, দিলেন বিশ্বনবীই (দঃ)। কিছুদিন পর তাকে আবার নবীর (দঃ) পবিত্র দরবারে ধরে নিয়ে আসা হলো ঐ একই অপরাধে অর্থাৎ মদ পান করার জন্য। এবারও তিনি যথাযথ শরাহ মোতাবেক তার শাস্তির আদেশ দিলেন। কিন্তু হাদীস বর্ণনাকারী [স্বয়ং ওমর (রাঃ)] কোনও উল্লেখ কোরলেন না যে রসুলুল্লাহ (দঃ) কোন রকম রাগ প্রকাশ কোরলেন বা কোন কসমও কোরলেন। উপস্থিত লোকজনের মধ্য থেকে একজন বোলে উঠলেন- এর ওপর আল্লাহর(Allah)লা'নত হোক, একই অপরাধের জন্য একে কতবার হাযির করা হোচ্ছে। ঐ সাহাবার কথা শুনে মহানবী (দঃ) বোললেন"একে লানত কোরো না, আল্লাহর(Allah)নামে আমি কসম কোরে বলছি এ আল্লাহ(Allah) ও তার রসুলকে ভালবাসে [হাদীস- ওমর বিন খাত্তাব (রাঃ) থেকে বোখারী]।" লক্ষ্য করুন, বিশ্বনবী (দঃ) ঐ মদখোরের পুনঃ পুনঃ মাতলামীর জন্য কসম খেলেন না, কসম খেলেন লোকটির সমর্থনে। আরেক দিন একজন লোক মদ খেয়ে মাতাল হোয়ে রাস্থায় গড়াগড়ি দিচ্ছিলো। লোকজন তাকে ধোরে মহানবীর (দঃ) দরবারে নিয়ে যাবার জন্য রওয়ানা হলো। (পথে ইবনে আব্বাসের (রাঃ) বাড়ী পড়ে) লোকজন ইবনে আব্বাসের বাড়ীর কাছে আসতেই লোকটি হঠাৎ সবার হাত ছাড়িয়ে দৌঁড়ে ইবনে আব্বাসের (রাঃ) বাড়ীতে ঢুকে তাকে জড়িয়ে ধরলো। লোকজন (তাকে তার কাছে থেকে ছাড়াতে না পেরে) আল্লাহর(Allah)রসুলের (দঃ) কাছে যেয়ে ঘটনা বললো। রসুলুল্লাহ (দঃ) ঘটনা শুনে হেসে ফেললেন এবং বোললেন "সে তাই কোরেছে নাকি?" বিশ্বনবী (দঃ) কোন শাস্তির কথা বোললেন না। (গ) নামায। একদিন কিছু আসহাব বিশ্বনবীর (দঃ) কাছে অভিযোগ কোরলেন যে অমুক গোত্রের সমুদয় লোকই ফযরের নামায সময় মত পড়ে না। শুনে আল্লাহর(Allah)রসুল (দঃ) বোললেন "তাই নাকি?" অতঃপর ঐ গোত্রের লোক সকলকে ডেকে আনা হলো। মহানবীর (দঃ) প্রশ্নের উত্তরে তারা স্বীকার কোরলেন যে তারা ফযরের নামায ফযরের সময় পড়েন না, ঘুমিয়ে থাকেন এবং অনেক পরে ঘুম থেকে ওঠার পর পড়েন। কারণ হিসেবে আরজ কোরলেন যে তারা সবাই কৃষি কাজ করেন। দিনের প্রচণ্ড রৌদ্রে মাঠে কাজ করা সম্ভব নয় বোলে রাত্রে কাজ করেন এবং শ্রান্ত ক্লান্ত হোয়ে শেষ রাত্রের দিকে ঘুমিয়ে পড়েন এবং ফযরের নামায সময়মত পড়া হয়না। শুনে আল্লাহর(Allah)রসুল (দঃ) তাদের অনুমতি দিয়ে দিলেন তারা যেমনভাবে নামায পড়ছে তেমনি পড়ার জন্য (হাদীস)।

একটি পুরো গোত্র সময় মত নামায পড়ে না জেনেও বিশ্বনবী (দঃ) কোন রকম রাগ কোরেছেন বোলে হাদীসের বর্ণনায় উল্লেখ নেই। একবার মহানবীকে (দঃ) জানানো হলো যে ওমুক লোক চুরি করে। তিনি রাগও কোরলেন না, উত্তেজিতও হলেন না, এমনকি ঐ লোকটিকে ধোরে আনতেও বোললেন না। সহজভাবে জিজ্ঞেস কোরলেন লোকটি কি নামায পড়ে? তাকে জানানো হলো যে, হ্যা, সে নামায অবশ্য পড়ে। শুনে মহানবী (দঃ) বললেন নামাযই ওকে চুরি থেকে একদিন বিরত কোরবে (হাদীস)। একদিন আল্লাহর(Allah)রসুল(দঃ) তার আসহাবসহ মসজিদে নববীতে বসা আছেন এমন সময় একজন গ্রাম্য আরব যে নিজেও ওখানে সবার সঙ্গে বসা ছিলো উঠে মসজিদের ভেতরেই পেশাব কোরতে শুরু করলো। সাহাবারা সবাই চেচিয়ে উঠলেন- এই থামো থামো (স্বভাবতই) । কিন্তু আল্লাহর(Allah)রসুল (দঃ) তার সাহাবাদের বোললেন ওকে বাধা দিও না, কোরতে দাও। তার আদেশে আসহাব বিরত হোলেন এবং লোকটি পেশাব করা শেষ করলো। তারপর বিশ্বনবী (দঃ) ঐ লোকটিকে কাছে ডেকে বুঝিয়ে বোললেন যে এই জায়গা আল্লাহর(Allah)এবাদতের জায়গা, আল্লাহ(Allah)কে স্মরণ ও কোরান পাঠের জায়গা। কাজেই এখানে কারো পেশাব পায়খানা করা উচিৎ নয়। তারপর তার আদেশে পানি এনে মসজিদ ধুয়ে ফেলা হলো [হাদীস- আবু হোরায়রা (রাঃ) এবং আনাস (রাঃ) থেকে বোখারী ও মুসলিম(Muslim)]। হাদীসের বর্ণনা এবং ভাষা থেকে একথা পরিষ্কার যে এমন একটা ঘটনায় তিনি বিন্দুমাত্র রাগ করেননি, একটুকুও উত্তেজিত হননি, লোকটাকে পেশাব শেষ কোরতে দিয়েছেন ও তারপর তাকে কাছে ডেকে শান্তভাবে তাকে বুঝিয়ে দিয়েছেন।

পাঠক পাঠিকাগণ! আপনাদের কাছে আমার বিশেষ অনুরোধ এই যে বর্তমান "আল্লাহর(Allah)রসুলের (দঃ) ক্রোধ" অধ্যায়টি মনোযোগ দিয়ে আরেকবার পড়ূন। আমি যে বারবার বোলছি যে মোহাম্মদের (দঃ) মাধ্যমে আল্লাহ(Allah) যে দ্বীন মানব জাতির জন্য পাঠিয়েছিলেন সেই দ্বীন এবং বর্তমানে আমরা ইসলাম(Islam) বোলে সে দ্বীনটাকে নিষ্ঠা ভরে পালন করি এই দুই দ্বীন পরস্পর বিরোধী-বিপরীতমুখী, এই কথার সত্যতা খুঁজে পাবেন। যে হাদীসগুলি উল্লেখ কোরেছি সেগুলো একটা একটা কোরে দেখুন আর চিন্তা করুন। দেখতে পাবেন যে সব ঘটনায় আল্লাহর(Allah)রসুল (দঃ) বিন্দুমাত্র বিচলিত হননি, সেইসব ঘটনায় বর্তমানের ধর্মীয় নেতারা কী কোরবেন। মসজিদে পেশাব করলে তো মেরেও ফেলতে পারেন। অন্যদিকে যে কাজে যে ব্যাপারগুলোয় সেই সর্বরিপুজয়ী সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব রেগে লাল হোয়ে গেছেন, উত্তেজনা ভরে কসম খেয়েছেন সেই হাদীসগুলি একটু দেখুন। দেখবেন সেই ব্যাপারগুলো শুধু যে মহা উৎসাহ ভরে করা হোচ্ছে তাই নয়, মহা পুণ্যের মহা সওয়াবের কাজ মনে কোরে করা হোচ্ছে। যে কাজগুলোকে বিশ্বনবী (দঃ) কুফর বোলে ঘোষণা দিয়েছেন, সেই কাজ যে যত বেশী কোরছে আজকের এই "দ্বীন ইসলামের" দৃষ্টিতে সে তত পাক্কা মুসলিম(Muslim)। লক্ষ্য কোরলে আরও একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দেখতে পাবেন। সেটা হোচ্ছে এই যে, ব্যক্তিগত মহাপাপ গুনাহে কবিরার ব্যাপারেও তিনি কিছুমাত্র রাগেননি। কিন্তু আজ আমাদের কাছে যে সব বিষয়ের কোন গুরুত্ব নেই- যেমন জাতীয় ঐক্য, লক্ষ্য (আকীদা, শৃংখলা, গুরুত্ববোধ ইত্যাদি এককথায় যেসব বিষয়গুলি পৃথিবীতে আল্লাহর(Allah)সংবিধান ও শাসন-প্রতিষ্ঠাকে ব্যাহত কোরতে পারে সেগুলির প্রত্যেকটায় তিনি ক্রোধান্বিত হোয়েছেন। কারণ হলো এই যে, আল্লাহর(Allah)সংবিধান কোরান এবং রসুলের (দঃ) হাদীস অনুযায়ী মানুষের জীবন শাসন ও পরিচালন করা হোলে, আল্লাহর(Allah)দেয়া আইন অনুযায়ী আদালতে বিচার করা হোলে, আল্লাহর(Allah)দেয়া দণ্ডবিধি অনুযায়ী অপরাধের শাস্তি দেয়া হোলে সমাজ থেকে ব্যক্তিগত অপরাধ নিজে থেকেই প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাবে। প্রমাণ ইসলামের প্রথম ৬০/৭০ বছরের ইতিহাস। অন্যদিকে ঐ কাজ না কোরে ব্যক্তিগতভাবে যত পুণ্যের-সওয়াবের কাজই করা হোক যত তাকওয়াহ করা হোক সমাজের সর্বপ্রকার অপরাধ বেড়েই চলবে, ফাসাদ-অন্যায়-অবিচার বেড়েই চলবে, সাফাকু-দ্দিমা, যুদ্ধ, রক্তপাত, হানাহানি বেড়েই চলবে, ইবলিস সফল ও কৃতকার্য হবে। প্রমাণ বর্তমান পৃথিবী। এক কথায় বিশ্বনবীর (দঃ) ও তার সাহাবাদের ইসলাম(Islam) সম্বন্ধে আকীদা আর আজকের আমাদের আকীদা বিপরীতমুখী। তাই বিশ্বনবীর (দঃ) আসহাব অর্দ্ধেক পৃথিবীতে বশ্যতা স্বীকার করিয়েছিলেন আর আজ আমরা পৃথিবীর সব জাতির লাথি খাচ্ছি, আখেরাতেও আমাদের জন্য জাহান্নাম অপেক্ষা কোরছে।

৩১। তাবুকের পরীক্ষা

উৎস: Islam and Dajjal
সমস্ত বইটিতে আমি দেখাতে চেষ্টা কোরেছি যে আকীদার বিকৃতির কারণে মুসলিম(Muslim) নামের এই জাতিটি আল্লাহ(Allah) ও রসুল (দঃ) যে দিক পানে এর গতি নির্দিষ্ট কোরে দিয়েছিলেন, তার ঠিক বিপরীত পানে চোলছে এবং চোলছে অতি তাকওয়ার সাথে। এই জাতি একথা বুঝতে পারছেনা যে, আল্লাহ(Allah) রসুলের পথের বিপরীত দিকে চোললে শত সহস্র তাকওয়াও নিষ্ফল, অর্থহীন, তা তাদের জান্নাতে নিয়ে যেতে পারবেনা। এই বিপরীত পথ এই জাতিকে নিয়ে গেছে এবং যাচ্ছে এই পৃথিবীতেই অন্য জাতির কাছে পরাজয় অপমান, ঘৃণিত গোলামীতে এবং পরকালে কঠিন শাস্তির পানে। আমি দেখাতে চেষ্টা কোরেছি যে, ইবলিসের চ্যালেঞ্জে জয়ী হবার জন্য আল্লাহ(Allah) তার রসুলকে (দঃ) যে দ্বীন জীবন-বিধান দিয়ে পৃথিবীতে পাঠালেন তা প্রতিষ্ঠা করার জন্য পথ, প্রক্রিয়া, তরিকা (Process) স্থির কোরলেন সামরিক। অর্থাৎ আল্লাহ(Allah) তার প্রেরিতকে (দঃ) এই নির্দেশ দিলেন না যে, তুমি মানুষকে বক্তৃতা, ওয়ায কোরে যুক্তি দিয়ে, এই দ্বীনের মাহাত্ম-গুণ বর্ণনা কোরে মানুষকে এটা গ্রহণ কোরতে আহ্বান কর। এ নির্দেশও দিলেন না যে তবলীগ কোরে পৃথিবীর মানুষকে এই দ্বীনে প্রবেশ করাও। এ নির্দেশ আল্লাহ(Allah) দেননি এই কারণে যে তিনি নিজে এই মানব জাতির স্রষ্টা, তিনি এর মনস্তত্বেরও স্রষ্টা। তাই তিনি জানেন যে এই মানুষের দেহের-মনের ভিতরে শক্তিশালী শয়তানকে প্রবেশ করার অনুমতি দেবার পর খুব কম সংখ্যক মানুষই এমন থাকবে যারা তাদের বিবেক, বুদ্ধি, যুক্তি, ব্যবহার কোরে দ্বীনের এই প্রকৃত শ্রেষ্ঠত্ব বুঝে রসুলের (দঃ) ঐ আহ্বানকে মেনে নিয়ে এই দ্বীন গ্রহণ কোরবে। কাজেই তিনি তার রসুলকে(দঃ) নির্দেশ দিলেন সামরিক শক্তি বলে এই কাজ করার। তার এই আদেশ কোরানময় ছড়িয়ে আছে। আল্লাহ(Allah)র এই নীতিকে বুঝে তার রসুল (দঃ) ঘোষণা কোরলেন "আমি আদিষ্ট হোয়েছি সশস্ত্র যুদ্ধ চালিয়ে যেতে যে পর্য্যন্ত না সমস্ত মানব জাতি এক আল্লাহ(Allah)কে সর্বময় প্রভু বোলে স্বীকার করে এবং আমাকে তার প্রেরিত বোলে মেনে নেয় (হাদীস)।" পেছনে বোলে এসেছি এ কাজ অর্থাৎ সমস্ত মানব জাতিকে এই দ্বীনের অধীনে আনা এক জীবনে অসম্ভব একথা আহাম্মকও বুঝবে। তাছাড়া সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে ঐ কাজ কোরতে গেলে অবশ্যই এমন একটি জাতি গঠন কোরতে হবে- যে জাতির সর্ব প্রধান চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যই হবে মৃত্যু ভয়হীন, দুর্দ্ধর্ষ যোদ্ধা। যে জাতি সমস্ত কিছু ভুলে তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে হবে অনঢ় (হানিফ), ঐক্য হবে ইস্পাত, সবরে (অটলভাবে অধ্যবসায়, প্রচেষ্টা চালাতে) হবে অদম্য। এর যে কোনটির অভাবে সাফল্য আসবেনা। কারণ উদ্দেশ্য, লক্ষ্য অতি বিরাট- সমস্ত মানব জাতির ওপর এই জীবন-বিধান প্রতিষ্ঠা। এমনি একটি দুর্দ্ধর্ষ সামরিক জাতি গঠন কোরতে হবে বোলেই আল্লাহ(Allah) এই জাতির জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ সম্মান ও সর্বশ্রেষ্ঠ পুরষ্কার স্থির কোরলেন ঐ বিরাট ও মহান উদ্দেশ্য অর্জনে যারা সশস্ত্র যুদ্ধে প্রাণ কোরবানী কোরবেন তাদের জন্য। শত সহস্র পাপ গুনাহ কোরলেও তাদের হিসাব নেয়া হবে না, কোন প্রশ্ন করা হবেনা, দেহ থেকে আত্মা বের হওয়ার সাথে সাথে তাদের সর্বোত্তম জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে। এতো গেলো পুরষ্কার। আল্লাহ(Allah) তাদের এমন সম্মান কোরলেন যে, তারা মরে গেলেও আমাদের অধিকার দেয়া হলো না তাদের মৃত বলার। আল্লাহ(Allah)র এই একটি মাত্র কাজ থেকেই এ কথা পরিষ্কার হোয়ে যায় যে, এই দ্বীনের সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কোনটি। আমি পেছনেও বোলে এসেছি আবারও বোলছি একটি প্রতিষ্ঠানের ঘোষিত পুরষ্কার যদি বিশ্ব অলিম্পিকে হকি খেলায় স্বর্ণ পদক জয় হয় তবে সেই প্রতিষ্ঠানটিকে হকি খেলার প্রতিষ্ঠান ছাড়া আর কি বলা যুক্তি সঙ্গত হবে?

আল্লাহ(Allah)র রসুলের (দঃ) জীবনীর দিকে এক নজর দিলেও এ সত্য প্রকট হোয়ে ওঠে যে তার জাতিটিকে উম্মাহকে একটি ধণ-প্রাণ উৎসর্গকারী মৃত্যুভয়হীন দুর্দ্ধর্ষ যোদ্ধা জাতি রূপে গঠন করাই ছিলো তার সবচেয়ে বড় প্রচেষ্টা। মাত্র তিনশ' তের জন যোদ্ধা নিয়ে তার প্রথম যুদ্ধ থেকে শুরু কোরে পরবর্তী যুদ্ধ গুলোতে যোদ্ধার সংখ্যা বাড়তে বাড়তে তার জীবনের শেষ অভিযান তাবুকে তার বাহিনীতে যোদ্ধার সংখ্যা দাঁড়ালো ত্রিশ হাজার। তদানিন্তন আরবের জনসংখ্যার দিকে লক্ষ্য কোরলে দেখা যায় এটা একটা বিরাট সংখ্যা। অর্থাৎ ঐ অনুপাতে এই বাংলাদেশে একটি বাহিনী দাঁড় করালে তার সংখ্যা হবে ষাট (৬০) লক্ষ যোদ্ধার। এই প্রথম ও শেষ যুদ্ধের মাঝখানে আল্লাহ(Allah)র রসুল(দঃ) ও ঐ সামরিক জাতির নেতা সাতাশটি যুদ্ধে নিজে নেতৃত্ব দিলেন, নিজে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ কোরলেন নয়টিতে, দারুণভাবে যখম হোলেন। কিন্তু তিনি জানতেন এইই যথেষ্ট নয়, কারণ তিনি জানতেন যে আল্লাহ(Allah) তার ওপর সমস্ত পৃথিবীতে এই দ্বীন প্রতিষ্ঠার যে মহাদায়িত্ব দিয়ে তাকে পাঠিয়েছেন তা তার এক জীবনে অর্জন করা সম্ভব নয়। তাই তার অবর্তমানে যে জাতির ওপর অর্থাৎ তার উম্মাহর ওপর সেই দায়িত্ব অর্পিত হবে সে জাতিকেও সেই সংগ্রামের জন্য তৈরী কোরতে হবে। তাই তার জীবনীতে দেখি তিনি প্রথম দিকের যুদ্ধগুলিতে নিজে নেতৃত্ব দেবার পর অভিযান পাঠাবার সময় অন্য মানুষদের হাতে বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়ে দিয়েছেন। উদ্দেশ্য নতুন নেতৃত্ব নতুন সেনাপতি সৃষ্টি করা, যারা তার পৃথিবী থেকে চলে যাবার পর এই সশস্ত্র সংগ্রাম চালিয়ে যাবার উপযুক্ত হবে। সারা জীবন ধোরে অক্লান্ত পরিশ্রম ও সাধনা কোরে এক অজেয় দুর্দ্ধর্ষ যোদ্ধা জাতি সৃষ্টি করার পর বিশ্বনবীর (দঃ) ইচ্ছা হলো পরীক্ষা কোরে দেখা যে তার হাতে গড়া এই জাতিটি সত্যিই কি উপযুক্ত হোয়েছে তার পৃথিবী থেকে চলে যাবার পর তার সুন্নাহ অনুসরন করার? এই জাতির চরিত্রে কি তিনি সেই দুঃসাহস- আল্লাহ(Allah) ছাড়া পৃথিবীতে আর কোন শক্তিকে ভয় না করার নির্ভিকতা; নেতার (দঃ) সুন্নাহ পালনের জন্য বিষয় সম্পত্তি ব্যবসা-বাণিজ্য স্ত্রী-পুত্র সমস্ত কিছু কোরবান করার মন; দুঃসহ কষ্ট সহ্য করার সবর এবং সর্বোপরি শাহাদাতের জন্য আকুল পিপাসা সৃষ্টি কোরতে পেরেছেন? অর্থাৎ এক কথায় তিনি দেখতে চাইলেন যে তার জীবনের সাধনা সফল হোয়েছে কি হয় নাই। তাই তিনি ডাক দিলেন তাবুক অভিযানের। এই অভিযানে যে অন্যান্য অভিযানের মত ছিলো না তার বেশ কয়েকটা প্রমাণ আছে।। কিন্তু তার আগে আমি একথা পরিষ্কার কোরতে চাই যে তাবুক আত্মরক্ষামূলক অভিযান ছিলোনা। যখন তাবুকে অভিযানের উদ্দেশ্য আমার কাছে প্রকাশ হলো তখন মনে পড়লো যে এই উম্মাহর অন্যান্য যুদ্ধের মত তাবুকের অভিযানকেও ইতিহাসে আত্মরক্ষামূলক বোলে বর্ণনা করা হোয়েছে। বলা হোয়েছে যে বণিকদের মারফৎ খবর পাওয়া গিয়েছিলো যে রোমানরা মুসলিম(Muslim)দের আক্রমণ করার জন্য সমবেত হোচ্ছে। যারা ইতিহাসে এই কথা লিখেছেন তারা ঐ বণিকদের কোন নাম পরিচয় দেননি। আল্লাহ(Allah)র রসুল (দঃ) এত কাঁচা লোক ছিলেন না যে অমন একটি উড়ো খবর শুনেই তিনি অস্বাভাবিক গরম, ফসল কাটার সময় ইত্যাদি উপেক্ষা কোরে বিরাট বাহিনী নিয়ে বের হোয়ে পড়বেন। মনে রাখতে হবে বিশ্বনবী (দঃ) জীবনের সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযান ছিলো তাবুক। এই অভিযানে যোগ দেয়ার জন্য এবং যার যা সামর্থ আছে তা এই অভিযানের আয়োজনের জন্য দান কোরতে তিনি সবাইকে আহ্বান কোরেছিলেন। এ সবই দু'একটা বণিকের মুখের কথায়? যে বণিকদের নাম বা গোত্রের বা কোথাকার কাফেলা তা পর্য্যন্ত এরা উল্লেখ কোরতে পারেননি? যাই হোক, আসল ব্যাপার যাচাই করার জন্য মহানবীর (দঃ) প্রথম প্রামান্য জীবনী বের করলাম মোহাম্মাদ ইবনে ইসহাকের সিরাত রসুলাল্লাহ। বিরাট বই, যাতে তার পূর্ণ জীবনের প্রায় প্রতিটি খুটিনাটি বর্ণনা করা আছে এবং প্রধানত যে বইয়ের ওপর ভিত্তি কোরে পরবর্তীতে রসুলাল্লাহর (দঃ) বিভিন্ন জীবনী লেখা হোয়েছে। যা ভেবেছিলাম তাই- ইবনে ইসহাকের সিরাতে রসুলাল্লাহর (দঃ) রোমান আক্রমণ প্রস্তুতির সম্বন্ধে কোন কথাই নেই, বণিকদের সম্বন্ধে ব অক্ষরও নেই। ইবনে ইসহাক লিখেছেন-"রসুলাল্লাহ(দঃ) জিলহজ্ব থেকে রজব পর্য্যন্ত মদীনায় অবস্থান কোরলেন এবং তারপর বাইযানটাইনদের (রোমান) বিরুদ্ধে অভিযানের জন্য প্রস্তুতির আদেশ দিলেন [সিরাত রসুলাল্লাহ(দঃ)-মোহাম্মদ বিন ইসহাক, অনুবাদ A. Guillaume, ৬০২ পৃঃ]।" অর্থাৎ সমস্ত পৃথিবীতে এই দ্বীনুল ইসলাম(Islam)কে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করার জেহাদ ছেড়ে দেবার পর অর্থাৎ আল্লাহ(Allah)র রসুলের (দঃ) প্রকৃত সুন্নাহ ত্যাগ কোরে প্রকৃত উম্মতে মোহাম্মদী হোতে বহিষ্কৃত হবার পর জেহাদকে আত্মরক্ষামূলক বোলে আখ্যায়িত করার যে মেরুদণ্ডহীন কাপুরুষোচিত চেষ্টা আরম্ভ করা হোয়েছিল তারই ফলে বণিকদের খবরের মিথ্যা বাহানা বহু পরে যোগ করা হোয়েছিলো এবং ঐ মিথ্যা ইতিহাসে স্থান কোরে নিয়েছে। পাশ্চাত্যের কাছে কর জোড়ে কৈফিয়ৎ দানকারী এই পণ্ডিতরা কিন্তু ওফাতের ঠিক আগে ওসামার (রাঃ) নেতৃত্বে সিরিয়ার যে অভিযানে প্রস্তুতি বিশ্বনবী (দঃ) নিয়েছিলেন এবং তার ওফাতের পর যে অভিযান আবু বকর (রাঃ) পাঠিয়েছিলেন সেটা সম্বন্ধে কোন আত্মরক্ষামূলক কারণ দেখাতে পারেননি। পারেননি কারণ কোন কারণ তারা উদ্ভাবন কোরতে পারেনি। অন্যান্য অভিযানগুলি থেকে তাবুকের অভিযান যে সব বিষয়ে ভিন্ন ছিলো সেগুলো হলো-(ক) কোন অভিযানের প্রস্ততির সময় বা অভিযানের আদেশ দেবার সময় আল্লাহ(Allah)র রসুল (দঃ) প্রকাশ কোরতেন না সে অভিযানের গন্তব্য কোথায় বা কাদের বিরুদ্ধে। বরং এমন হাবভাব প্রকাশ কোরতেন, এমন পরোক্ষভাবে অভিযানের গন্তব্য স্থানের কথা উল্লেখ কোরতেন যে যারা শুনতো তারা প্রকৃত গন্তব্য স্থানের বিপরীত ধারণাই করতো। এটা শত্রুর গোয়েন্দাদের (Intelligence) ধোঁকা দেয়ার জন্য তিনি কোরতেন। শত্রুকে ধোঁকা দেয়া তাদের মধ্যে ভূল ধারণা সৃষ্টি করা প্রতি যুদ্ধের অবশ্য করণীয় কৌশল। কিন্তু তাবুকের অভিযানের লক্ষ্য ও গন্তব্য স্থানের কথা তিনি এই প্রথম বারের মত প্রকাশ্যে ঘোষণা কোরে দিলেন এবং সেটা হলো বাইযানটাইন অর্থাৎ পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে। ঐ সময় পৃথিবীতে ছিলো দু'টি মহাশক্তি, বিশ্বশক্তি। একটি ঐ রোমান শক্তি এবং অপরটি পারস্য সাম্রাজ্য শক্তি। কিছুদিন আগে পর্য্যন্ত যেমন পৃথিবীতে দুইটি বিশ্বশক্তি ছিলো- যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন, তেমনি। ঐ রোমান ও পারস্য শক্তি দু'টোর মধ্যে সব সময় প্রতিদ্বন্দ্বিতা লেগেই থাকতো পৃথিবীর আধিপত্য নিয়ে, এবং সময়ে সময়ে সশস্ত্র সংঘর্ষও লেগে যেতো। কোন সময় রোমান শক্তি জিততো কোন সময় পারস্য। কিন্তু অন্য কোন শক্তি চিন্তাও কোরতে পারতোনা এদের যে কোন একটির সাথে যুদ্ধ করার, সংঘর্ষে যাওয়ার।

ঐ বিশ্বশক্তির একটির বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা কোরে মহানবী (দঃ) দেখতে চাইলেন তার জাতির মধ্যে কী প্রতিক্রিয়া হয়। তার ঐ অতি দরিদ্র ক্ষুদ্র জাতি যার সমগ্র লোকসংখ্যা বিরাট, পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের একটি ছোট প্রদেশের লোকসংখ্যার চেয়েও কম তারা ভয় পায় কি না। তার (দঃ) ঐ ক্ষুদ্র জাতি এতদিন আরবের ভেতরে আরবদের বিরুদ্ধেই লড়েছে কিন্তু এবার তিনি যাদের সঙ্গে যুদ্ধের কথা ঘোষণা কোরলেন তারা আরব নয়, তারা রোমান- যাদের আরবরা চিরদিন ভয় কোরে এসেছে। এ ভীতির ব্যপারে যে আরবরা তখনও সচেতন তার প্রমাণ হলো যারা দুর্বলচেতা এবং মোনাফেক ছিলো তারা অভিযানে যাওয়া থেকে পলায়ন করার চেষ্টা তো কোরলোই তার ওপর যারা যাবার মনস্থ কোরেছিলেন তাদের কী বোলে ভয় দেখাবার চেষ্টা কোরেছিলো তা দেখুন। ওয়াদিয়া বিন সাবেত প্রমুখ মোনাফেকরা মো'মেনদের এই বোলে ভয় দেখালো যে, "তোমরা কি ভেবেছো যে বাইযানটাইনদের সঙ্গে যুদ্ধ করা আরবদের সঙ্গে যুদ্ধ করার মত? আল্লাহ(Allah)র কসম, আমরা দেখতে পাচ্ছি অতি শীঘ্রই তারা তোমাদের দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলবে [সিরাত রসুলাল্লাহ (দঃ) -মোহাম্মদ বিন ইসহাক, অনুবাদ Guillaume, ৬০৬ পৃঃ]।" বিশ্বনবী (দঃ) জানতেন যে অতি শীঘ্রই তার জাতিকে শুধু ঐ রোমান নয় অন্য বিশ্বশক্তি পারস্যের বিরুদ্ধেও সশস্ত্র সংগ্রাম কোরতে হবে এবং পরবর্তীতে পৃথিবীর অন্যান্য জাতিসমূহের বিরুদ্ধেও লড়তে হবে যখন তার নিজের ওপর আল্লাহ(Allah)র দেয়া দায়িত্ব তার ওফাতের পর তার উম্মাহর ওপর অর্পিত হবে। জাতি মানসিকভাবে সেজন্য প্রস্তুত হোয়েছে কিনা, সেই দুঃসাহস অর্জন কোরেছে কিনা তা পরীক্ষা কোরে দেখার জন্যই তিনি এই প্রথম বারের মত তার অভিযানের উদ্দেশ্য প্রকাশ্যে ঘোষণা কোরে দিলেন।

(খ) বিশ্বনবী (দঃ) যখন তাবুকের অভিযানের আদেশ কোরলেন তখন অন্যান্য বছরের চেয়ে অনেক বেশী গরম পড়েছিলো। আমার ব্যক্তিগত অভিমত এই যে ঐ গরম আল্লাহ(Allah)র সঙ্গে পরামর্শ ও পরিকল্পনা কোরেই করা হোয়েছিলো উম্মাহকে পরীক্ষা করার জন্য। এত গরম ও খরা পড়েছিলো যে মানুষ অস্থির হোয়ে একটু ছায়ার জন্য ব্যাকুল হোয়ে পড়েছিলো। ঐ রকম অসহ্য গরমে জাতি তার কর্তব্য অবহেলা করে কিনা তা পরীক্ষা করাই ছিলো আল্লাহ(Allah)র রসুলের (দঃ) উদ্দেশ্য। (গ) বিশ্বনবী (দঃ) অভিযানের জন্য এমন সময় বেছে নিলেন যখন মদীনার সমস্ত খেজুর বাগানের খেজুর পেকেছে আর কয়েকদিন পরই ফসল কাটা আরম্ভ হবে। মনে রাখতে হবে অন্যান্য দেশের ধান বা গমের মত মদীনার প্রধান ফসল হলো খেজুর। অনেক কষ্টে চাষ কোরে অনেক যত্ন কোরে ফসল পাকলে ঠিক কাটার সময় তিনি ডাক দিলেন অভিযানে বের হওয়ার । উদ্দেশ্য- পরীক্ষা করা যে জেহাদের ডাকে এই জাতি পাকা ফসল রেখে আল্লাহ(Allah)র রাস্তায় প্রাণ দেবার জন্য প্রস্তুত হোয়েছে কিনা। (ঘ) এবারের গন্তব্য স্থান হলো বহুদূর। এতদিন এই জাতি আরবের মধ্যেই যুদ্ধ কোরেছে, বাইরে যায়নি। এবার বিশ্বনবী (দঃ) ডাক দিলেন আরবের গণ্ডী ছাড়িয়ে বাইরে যাবার। উদ্দেশ্য হলো ভবিষ্যতে যে কাজের জন্য তিনি এই জাতিকে তৈরী কোরেছেন সেই কাজ অর্থাৎ আল্লাহ(Allah)র দ্বীনকে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা করার জন্য স্বদেশ থেকে বের হোয়ে যাবার প্রথম স্বাদ জাতিকে দেয়া। এই শিক্ষা যে কেমন সাফল্য লাভ কোরেছিলো ইতিহাস তার সাক্ষী। প্রায় সম্পূর্ণ জাতিটিই অস্ত্র হাতে আরব থেকে বের হোয়ে গিয়েছিলো এবং শতকরা আশী জন আর স্বদেশে ফেরেননি- তাদের নেতার (দঃ) প্রকৃত সুন্নাহ পালন কোরতে যেয়ে। যে সব দুর্বলচেতা লোক এই দূরত্বের ভয়ে তাবুক অভিযানে যোগ দেয়নি তাদের সম্বন্ধে আল্লাহ(Allah) কোরানে বলছেন "এটা যদি কাছাকাছি কোন অভিযান হতো এবং পথ সংক্ষিপ্ত হতো তবে তারা তোমার (নবীর) অনুসরণ কোরতো কিন্তু ঐ দূরযাত্রা তাদের ওপর ভারী হোয়ে গিয়েছিলো (কোরান- সূরা আত-তওবা- ৪২)। (ঙ) বিশ্বনবী (দঃ) সবাইকে যার যা সামর্থ আছে সেই মোতাবেক ঐ অভিযানে সাহায্য কোরতে আহ্বান কোরলেন। তার এই কাজটাও ঐ অভিযানের গন্তব্যস্থানের কথা প্রকাশ করার মতো প্রথম বারে মত হলো। অর্থাৎ এর আগে কোন অভিযানে এমন কোরে যার যা সামর্থ আছে তা দিয়ে সাহায্য করার জন্য আহ্বান করেননি। এর উদ্দেশ্য ছিলো পরীক্ষা কোরে দেখা যে আল্লাহ(Allah)র রাস্তায় জেহাদে তার জাতি পার্থিব সব কিছু কোরবান করার জন্য কতখানি প্রস্তুত হোয়েছে। (চ) অন্যান্য অভিযানগুলি থেকে আরও একটা বৈশিষ্ট্য হলো এইযে, এবার মহানবী (দঃ) সমস্ত জাতিটাকে অভিযানে বের হবার ডাক দিলেন। উদ্দেশ্য পরীক্ষা (Test) কোরে দেখা যে তিনি যে একটি সামরিক জাতি সৃষ্টি কোরতে সাধনা কোরেছেন তা সাফল্য মণ্ডিত হোয়েছে কিনা। কারণ তিনি জানতেন যে ভবিষ্যতে তা ঐ যোদ্ধা জাতিকে অস্ত্র হাতে দেশ ত্যাগ কোরতে হবে আল্লাহ(Allah)র দ্বীনকে পৃথিবীময় প্রবর্তন কোরে মানব জাতির মধ্যে ন্যায়-বিচার, শান্তি প্রতিষ্ঠা কোরে, ইবলিসের চ্যালেঞ্জে আল্লাহ(Allah)কে জয়ী কোরতে। এই দায়িত্ব থেকে যে কেউ মুক্তি পাবে না তার প্রমাণ এই যে, যে তিনজন প্রকৃত মো'মেন ঐ প্রচণ্ড গরমের জন্য নিজেদের গাফলতির জন্য যাব-যাচ্ছি কোরে তাবুক অভিযানে যোগ দেন নাই এবং যেজন্য আল্লাহ(Allah) তাদের পঞ্চাশ দিন একঘরে অর্থাৎ মুসলিম(Muslim) সমাজ থেকে বহিষ্কার কোরে মর্মান্তিক শাস্তি দিলেন সেই তিনজনের মধ্যে একজন হেলাল বিন উমাইয়া (রাঃ) ছিলেন বৃদ্ধ, এবং এতখানি বৃদ্ধ যে তাকে খেদমতের জন্য একজন কেউ না থাকলে চলেনা এবং এজন্য তার স্ত্রীকে আল্লাহ(Allah)র রসুলের (দঃ) কাছ থেকে ঐ খেদমতের বিশেষ (Special) অনুমতি নিতে হোয়েছিলো। যদি হেলালের (রাঃ) মত বৃদ্ধ সশস্ত্র সংগ্রাম না করার ঐ শাস্তি পেয়ে থাকেন তবে আর কে আছে যে এই জাতির উম্মাহর একজন বোলে দাবীদার হোয়েও সশস্ত্র সংগ্রাম না কোরেও জান্নাতের আশা করে? জীবনের সাধনা সফল হোয়েছে কি-না তা পরীক্ষায় বিশ্বনবী (দঃ) ডাক দিলেন সমস্ত জাতিটাকে। তার প্রমাণ এই যে অভিযান থেকে ফিরে এসে তিনি বোসলেন হিসাব নিতে, কে কে অভিযানে অংশ নেয়নি তার। যারা অংশ নেয়নি তাদের সম্বন্ধে আল্লাহ(Allah) বোললেন- যখন তুমি (অভিযান থেকে) ফিরবে তখন তারা আল্লাহ(Allah)র হলফ কোরে (অযুহাত দিয়ে) বোলবে তাদের যেন কিছু করা না হয়। তাদের ছেড়ে দাও, কারণ তারা অপবিত্র এবং তাদের স্থান হোচ্ছে জাহান্নাম। তাদের কাজের প্রতিফল হিসাবে তারা তাদের অযুহাত (কৈফিয়ৎ) হলফ কোরে বোলবে যাতে তুমি তা গ্রহণ কর। তুমি গ্রহণ কোরলেও আল্লাহ(Allah) ফাসেক লোকদের (কৈফিয়ৎ) গ্রহণ করেন না (কোরান-সূরা আত-তওবা- ৯৫, ৯৬)। আল্লাহ(Allah)র নির্দেশ মোতাবেক তাবুক অভিযানে যারা না যেয়ে বিভিন্ন অযুহাত-কৈফিয়ৎ দিয়েছিলো তাদের মহানবী (দঃ) ছেড়ে দিলেন, কিছু বোললেন না, কারণ আল্লাহ(Allah) তো বোলেই দিলেন যে তারা অপবিত্র, তাদের স্থান জাহান্নামে। যে তিনজন গড়িমসি কোরে যাননি কিন্তু রাসুলাল্লাহ (দঃ) মদীনায় ফেরার পর যখন বুঝেছেন কী সাংঘাতিক অপরাধ কোরে ফেলেছেন তখন কোন অযুহাত, কোন কৈফিয়ৎ দাঁড় না কোরে অকপটে অপরাধ স্বীকার কোরলেন, তাদের আল্লাহ(Allah) মুসলিম(Muslim) সমাজ থেকে বহিষ্কার কোরে দিলেন। যদিও বহুদিন মর্মান্তিক শাস্তির পর আল্লাহ(Allah) তাদের অকপটতার জন্য মাফ কোরে দিয়েছিলেন।

মনে রাখতে হবে বিশ্বনবী (দঃ) তাবুক অভিযানের ডাক দিয়েছিলেন নবম হিজরীতে, অর্থাৎ তার কর্মজীবনের শেষ দিকে। এই যে তিনি পরীক্ষা কোরে দেখতে চাইলেন যে তার সারা জীবনের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফল কী হোয়েছে তাতে কী দেখা গেলো? দেখা গেলো (ক) বিশ্বনবীর (দঃ) কর্মবহুল জীবনের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিলো একটি অপরাজেয় দুর্দ্ধর্ষ যোদ্ধা জাতি সৃষ্টি করা। কারণ শেষ জীবনে তিনি সফল কি সফল নন তা পরীক্ষা কোরতে যেয়ে তিনি এ পরীক্ষা কোরলেন না যে, তার সৃষ্ট জাতিটি কেমন ধার্মিক হোয়েছে বা কেমন রিপুজয়ী সাধু হোয়েছে বা কেমন পণ্ডিত হোয়েছে বা কেমন কোরানের মোফাসসির হোয়েছে বা কেমন মুফতি হোয়েছে বা কেমন মোবালি্লগ হোয়েছে বা কেমন মোহাদ্দিস হোয়েছে বা কেমন মুত্তাকী হোয়েছে। তিনি এসব কিছুরই পরীক্ষা নিলেন না। তিনি নিলেন জাতি একটি বিশ্বশক্তির সম্মুখীন হবার মত নির্ভীক ও দুঃসাহসী হোয়েছে কিনা; দুঃসহ গরম ও সুদূর পথ তাদের বিচলিত কোরতে পারে কিনা; কঠোর পরিশ্রমের ফসলকে আল্লাহ(Allah)র রাস্তায় হেলায় পরিত্যাগ কোরতে পারে কিনা; আল্লাহ(Allah)র রাস্তায় সশস্ত্র সংগ্রামে তাদের পার্থিব সম্পদ দান কোরতে পারে কিনা এবং সর্বোপরি আল্লাহ(Allah)র রাস্তায় সশস্ত্র সংগ্রামে শাহাদাত লাভের জন্য আগ্রহী হোয়েছে কিনা। তাবুকের পরীক্ষায় দেখা গেলো আল্লাহ(Allah)র রসুলের (দঃ) জীবনের সাধনা সফল হোয়েছে। কারণ সমস্ত জাতি থেকে মাত্র আশী জনের মত দুর্বলচেতা ও মোনফেক তাবুক অভিযানে যোগ দেয়নি, ঐ তিনজন প্রকৃত মোমেন ছাড়া। অর্থাৎ শতকরা মাত্র ০.২৬ জন মানুষ অভিযানে যোগ দেয়নি। ধোরতে গেলে শতকরা একশ জন, সম্পূর্ণ জাতিটাই বিশ্বনবীর ডাকে শত্রু বিশ্বশক্তি ও নিজেরা কত দুর্বল জেনেও নিজেদের পার্থিব সম্পদ অভিযানের প্রস্তুতির জন্য দান কোরে পাকা ফসল পরিত্যাগ কোরে অসহ্য গরমের মধ্যে মরভুমির বুকের উপর দিয়ে বহু দূরের যাত্রায় নিজেদের প্রাণ কোরবান করার জন্য রওয়ানা হোয়ে গেলো। মানব জাতির ইতিহাসে এমন নেতা আর কখনও জন্মাননি যিনি মাত্র তেইশ বছরে, প্রকৃত পক্ষে দশ বছরে একটি উপেক্ষিত, অবহেলিত চরম দারিদ্র, বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠীকে এমন রূপান্তর কোরতে পেরেছেন।

আজ যারা নিজেদের উম্মতে মোহাম্মদী মনে কোরে নানা রকম সওয়াব উপার্জনে ব্যস্ত আছেন তারা মেহেরবানী কোরে নিজেদের ঐ উম্মাহ, জাতির সঙ্গে একটু তুলনা কোরে দেখুন যে বিশ্বনবীর (দঃ) হাতে গড়া যে জাতিটি তাবুক অভিযানে গেলো এবং আজকের যে আমরা একই জাতি, একই উম্মাহ কিনা। তারা দেখতে পাবেন এক তো নয়ই বরং সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী দু'টো জাতি। রসুলুল্লাহ (দঃ) যে সর্বত্যাগী দুর্দ্ধর্ষ যোদ্ধা জাতি সৃষ্টি কোরেছিলেন যার প্রমাণ তাবুক, তার ঠিক উল্টো যদি কিছু থেকে থাকে তবে সেটা বর্তমানের আমরা। আমরা যে “সওয়াব” কামাইয়ের কাজে অত্যন্ত ব্যস্ত আছি তা এবং প্রকৃত সওয়াব কি তা বিশ্বনবীর (দঃ) একটি কাজ থেকে সুস্পষ্ট হোয়ে উঠে। যিনি ঐ যোদ্ধা জাতি সৃষ্টি কোরেছিলেন তার কাছে সওয়াব কি আর আমাদের কাছে সওয়াব কি তার তফাৎ দেখা যায় এই হাদীসটি থেকে। আল্লাহ(Allah)র রসুল (দঃ) একদিন একজন লোকের জানাযা পড়তে আসলেন। যখন মৃত ব্যক্তিকে রাখা হলো তখন ওমর বিন খাত্তাব (রাঃ) বোললেন, "ইয়া রসুলাল্লাহ! এর জানাযা পড়বেন না, এ লোকটি একজন ফাজের।" তখন মহানবী (দঃ) সমবেত জনতার দিকে চেয়ে জিজ্ঞাসা কোরলেন, "তোমাদের মধ্যে কেউ এই লোককে ইসলামের কোন কাজ কোরতে দেখেছো?" একজন লোক বোললেন, " হ্যাঁ রসুলুল্লাহ! ইনি কোন অভিযানে অর্দ্ধেক রাত্রি প্রহরা দিয়েছেন।" এই শুনে রসুলুল্লাহ (দঃ) ঐ লোকের জানাযায় নামায পড়ালেন এবং দাফন করার পর তার কবরের ওপর মাটি ছিটালেন। তারপর (মৃত ব্যক্তিকে লক্ষ্য কোরে) বোললেন, "তোমার সঙ্গী-সাথীরা ভাবছে তুমি আগুনের সঙ্গী (জাহান্নামী)। আর আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি তুমি জান্নাতের অধিবাসী। হে ওমর! নিশ্চয়ই তোমাকে মানুষের কাজ সম্বদ্ধে প্রশ্ন করা হবে না। কিন্তু প্রশ্ন করা হবে অন্তর্নিহিত চরিত্র সম্বন্ধে [হাদীস- ইবনে আ'য়েয (রাঃ) থেকে- বায়হাকি, মেশকাত]"। এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হোচ্ছে, ওমর মৃত লোকটি সম্বন্ধে যে শব্দটা ব্যবহার কোরলেন সেটা হলো ফাজের; যার আভিধানিক অর্থ হলো যার চলাফেরা-কাজকর্ম খারাপ, গুনাহগার, এক কথায় দুষ্কৃতকারী। যেহেতু ওমরের (রাঃ) ঐ অভিমত কেউ আপত্তি কোরলেন না এবং তারপর বিশ্বনবী (দঃ) যখন জিজ্ঞাসা কোরলেন যে ঐ লোকটিকে কেউ কোন দিন ইসলামের কোন কাজ কোরতে দেখেছে কিনা, তখন ঐ এক রাত্রি সামরিক ছাউনী পাহারা দেয়ার কাজ ছাড়া আর কেউ কিছু বোলতে পারলেন না সেহেতু ঐ মৃত ব্যক্তি নিঃসন্দেহে অতি খারাপ, অতি গোনাহগার লোক ছিলেন। কিন্তু ঐ একটি কাজের জন্য আল্লাহ(Allah)র নবী (দঃ) তার জানাযার নামায তো পড়ালেনই, তার ওপর সকলের সামনে প্রকাশ্যে ঘোষণা কোরলেন যে ঐ দুষ্কৃতকারী পাপী জান্নাতবাসী। আজ আমরা গোনাহ ও সওয়াবের যে হিসেব করি সে হিসাবে রসুলাল্লাহর (দঃ) কাজ অবশ্যই বিপরীত। আসলেই বিপরীত। পেছনে বহুবার বোলে এসেছি বিশ্বনবীর (দঃ) ও তার আসহাবের (রাঃ) ইসলাম(Islam) আর আজকের আমাদের ইসলাম(Islam) এ দু'টো বিপরীতমুখী দ্বীন। কারণ এই দুটোর আকীদা বিপরীত। একটি বর্হিমুখী, সংঘাত-সংঘর্ষমুখী; অন্যটি অন্তর্মুখী, সংঘর্ষ থেকে পলায়নমুখী। গোনাহগার দুশ্চরিত্র হওয়া সত্বেও ঐ মৃত লোকটির একটি কাজ থেকে বোঝা গেল যে শেষ নবী (দঃ) যে যোদ্ধা জাতি সৃষ্টি কোরেছিলেন সে তাতে বিশ্বাসী ছিলো, তাতে অংশ নিয়েছিলো এবং প্রহরা দেওয়ার মত সামান্য কাজ হোলেও তা কোরেছিলে। এই দ্বীনের যে প্রকৃত , আসল কাজ তাতে সে যোগ দিয়েছিলো। কাজেই সে কত সওয়াব কামিয়েছে তার কোন হিসাব দরকার নেই সে কত গোনাহ করেছে সে হিসাবেরও দরকার নেই, আল্লাহ(Allah) তাকে জান্নাতে দেবেন। আল্লাহ(Allah)র রসুলের (দঃ) ঐ কাজের পরও যারা জেহাদ ও কিতাল-সশস্ত্র সংগ্রামকে-ঈমানের পর জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ কর্তব্য হিসাবে না নিয়ে এবং সেই মোতাবেক কাজ না কোরে সওয়াব কামাবার চেষ্টায় আছেন, তারা কামাতে থাকুন। কেয়ামতের হিসাবের দিনে তারা দেখবেন তাদের স্থান কোথায় হয়- জান্নাতে না জাহান্নামে। বিশ্বনবীর (দঃ) ও তার উম্মাহার ওপর আল্লাহ(Allah) যে কর্তব্য ও দায়িত্ব অর্পণ কোরলেন সেই দায়িত্ব অর্থাৎ পৃথিবীর প্রচলিত সমস্ত জীবন-ব্যবস্থা মিটিয়ে দিয়ে শেষ দ্বীন প্রতিষ্ঠা এই দায়িত্ব পালন কোরতে গেলে যে চরিত্রের মানুষ প্রয়োজন বিশ্বনবীকে (দঃ) অবশ্যই সেই চরিত্রের মানুষ ও জাতি গঠন করার চেষ্টা কোরতে হয়েছে তাই নয় কি। এবং ইতিহাস সাক্ষী তিনি এমন সফল হোয়েছিলেন যেমন সফল মানব জাতির মধ্যে কেউ হোতে পারেনি। তিনি যে চরিত্র সৃষ্টি কোরেছিলেন সেটা কী চরিত্র? সাধু সন্ন্যাসী? ফকির-দরবেশ? কবি সাহিত্যিক? ফকীহ মোফাসসীর? এর জবাব আমরা পাই তার মেয়ের বিয়ের ব্যাপারে। তার (দঃ) অতি আদরের অতি মোহাব্বতের মেয়ে ফাতেমা (রাঃ) বিয়ে দিলেন তার সাহাবা আলীর (রাঃ) সঙ্গে। একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে মহানবী (দঃ) তার উম্মাহর যে চরিত্র সৃষ্টি কোরতে চেয়েছিলেন আলীর(রাঃ) মধ্যে সে চরিত্র পরিপূর্ণ ভাবে বিকাশ হোয়েছিলো, তা না হোলে আল্লাহ(Allah)র রসুল (দঃ) জান্নাতের রাণীকে তার হাতে তুলে দিতেন না। এখন দেখা যাক কী ছিলো সেই চরিত্র। বিয়ে ঠিক হবার পর বিশ্বনবী (দঃ) আলীকে (রাঃ) জিজ্ঞাসা কোরলেন তার কাছে কি আছে? বিয়েতে কিছু খরচ হবে তো। আলী (রাঃ) জবাব দিলেন টাকা পয়সা কিছুই নেই। থাকার মধ্যে তার কাছে আছে শুধু একটি ঘোড়া, একটি তলোয়ার আর একটি লোহার বর্ম। লক্ষ্য করুণ একটি মানুষের পার্থিব সম্পদ বোলতে আছে একটি ঘোড়া, একটি তরবারি আর বর্ম। তিনটিই যুদ্ধের উপকরণ এবং ও ছাড়া তার আর কিছুই নেই। অর্থাৎ এক কথায় আলীর (রাঃ) জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ ও বোধহয় একমাত্র লক্ষ্য হলো, যুদ্ধ, জেহাদ, তাই আর কিছু থাকুক না, থাকুক যুদ্ধের উপকরণ থাকবেই থাকবে, না খেয়ে থাকলেও অস্ত্র থাকবে। এই মনোভাব, আকীদা শুধু আলীর (রাঃ) ছিল না, প্রকৃত উম্মতে মোহাম্মদীর প্রত্যেকেরই তাই ছিলো। আলীর (রাঃ) বিয়ের বহু পরে এই প্রকৃত উম্মতে মোহম্মদী যখন তাদের ওপর আল্লাহ(Allah)র ও রাসুলের(দঃ) অর্পিত দায়িত্ব পালন কোরতে কোরতে সুদূর মিসরে যেয়ে পৌঁছেছিলো তখনও তাদের একজন উবায়দা (রাঃ) খ্রীস্টান শাসনকর্তাকে বোলেছিলেন- আমরা (উম্মতে মোহাম্মদী) বেঁচেই আছি শুধু জেহাদ করার জন্য। এ দুনিয়াতে শুধু বেঁচে থাকার জন্য খাওয়া আর গায়ে পড়ার কাপড় ছাড়া আমরা আর কিছুই চাই না। আমাদের জন্য ঐ দুনিয়া (পরকাল)। এই হলো প্রকৃত মোমেন, মুসলিম(Muslim) আর উম্মতে মোহাম্মদীর সঠিক আকীদা।

তারপর দেখুন মহানবী (দঃ) কি কোরলেন। তিনি আলীকে (রাঃ) বোললেন আর যখন কিছুই নেই তখন ঐ বর্মটি বন্ধক দিয়ে কিছু টাকা নিয়ে আসো। তাই করা হলো এবং ঐ বর্ম বন্ধক দিয়ে বিয়ের খরচ চালানো হলো। ঘোড়া তলোয়ার আর বর্মের মধ্যে আদেশ হলো বর্ম বন্ধক দিতে। কেন? তলোয়ার ছাড়া যুদ্ধ সম্ভবই নয়, ঘোড়া ছাড়া খুবই অসুবিধা, একজন অশ্বারোহীকে পদাতিক হোয়ে যেতে হয়। কিন্তু বর্ম ছাড়া যুদ্ধ সম্ভব যদিও তাতে বিপদের আশংকা বেড়ে যায়। অর্থাৎ যুদ্ধ যেন কোন অবস্থাতেই বন্ধ না হয়। আলীর (রাঃ), নিজের জামাতার জীবনের আশংকা বেড়ে গেলেও নয়। পৃথিবীখ্যাত প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর মেরিটাস বিখ্যাত ইতিহাসবিদ মিঃ ফিলিপ হিট্টি তার বই The Arabs এ মুসলিম(Muslim) জাতির, উম্মতে মোহাম্মদীর অবিশ্বাস্য সামরিক বিজয়ের যে কারণগুলি উল্লেখ কোরেছে তার মধ্যে অন্যতম প্রধান কারণ হিসাবে তিনি লিখেছেন মুসলিম(Muslim)দের মৃতুভয়হীনতা। ইংরাজিতে তিনি শব্দ ব্যবহার কোরেছেন Utter contempt of death আক্ষরিক শব্দার্থে মৃত্যুর প্রতি চরম অবজ্ঞা। উম্মতে মোহাম্মদীর মৃত্যুর প্রতি এই অবজ্ঞার কথা হিট্টি তার ঐ বইয়ে দুইবার উল্লেখ কোরেছেন (The Arabs-P.K. Hitti,Gateaway Edition.Chicago,p-35,58,)। এবং তিনি একথাও ঐ সঙ্গে লিখেছেন যে ঐ মৃত্যুভয়হীনতা মৃত্যুর প্রতি ঐ চরম অবজ্ঞা ঐ জাতির মধ্যে সৃষ্টি কোরেছিলো তাদের বিশ্বাস অর্থাৎ ইসলাম(Islam)।

আমি পেছনে লিখে এসেছি যে বিশ্বনবী (দঃ) যে ইসলাম(Islam) মানব জাতির জন্য রেখে গেছেন সেই ইসলাম(Islam) আর বর্তমানে যে ইসলাম(Islam) পৃথিবীতে চালু আছে তা দু'টি সম্পূর্ণ ভিন্ন, বিপরীতমুখী দ্বীন, ধর্ম। আমার কথার প্রমাণ এখানে হোয়ে যাচ্ছে। রসুলাল্লাহর (দঃ) ইসলাম(Islam) তার উম্মতের মধ্যে সৃষ্টি কোরেছিলো মৃত্যুর প্রতি চরমতম অবজ্ঞা, শাহাদাতের জন্য উদগ্র পিপাসা। আর আজকের ওলামা ও মাশায়েখদের ইসলাম(Islam) এই জাতির মধ্যে সৃষ্টি কোরে মৃত্যুভয়, জঘন্য কাপুরুষতা, সমস্ত সংগ্রাম-সমস্ত সংঘর্ষ থেকে পলায়নের চরিত্র। রসুলাল্লাহর (দঃ) শেখানো ইসলামের বিপরীতমুখী, বর্তমানের ইসলামের তৈরী মুসলিম(Muslim)দের সম্বন্ধে আল্লাহ(Allah) ও তার রসুলের (দঃ) মনোভাব কি তা পেশ কোরছি। প্রথমে আল্লাহ(Allah) কি বোলছেন। তিনি বোলছেন যখন কোন সূরায় (কোরানের) যুদ্ধ উল্লেখ করা হয় তখন যাদের হৃদয়ের মধ্যে রোগ আছে তাদের অবস্থা এমন হয় যে তারা যেন তখনই অজ্ঞান হোয়ে মৃত্যুমুখে পতিত হোয়ে যাবে (কোরান- সূরা মোহাম্মদ- ২০)। সমস্ত মুফাসসিররা " যাদের হৃদয়ের মধ্যে রোগ আছে" এর অর্থ কোরেছেন মোনাফেকরা। সহজ কথায় মুসলিম(Muslim) হোতে হোলে যুদ্ধ কোরতে হবে ঐ কথায় যারা ভয়ে অর্দ্ধ-মৃত হোয়ে যায় তারা মোনাফেক। এদের আল্লাহ(Allah) লানত, অভিশাপ দিয়েছেন কোরানে, একবার নয় বহুবার। বর্তমানের এই মুসলিম(Muslim) জাতিকে যুদ্ধের ডাক দিলে তাদের কোরানে বর্ণিত অবস্থার মত হয়, এবং সেটা হয় মৃত্যুভয়ে। এখন মহানবী (দঃ) কি বোলছেন তা দেখা যাক। তার উম্মাহর ভবিষ্যত সম্বন্ধে বোলতে যেয়ে তিনি যখন বোললেন তার উম্মাহ শত্রুদের দ্বারা পরাজিত, লাঞ্ছিত-অপমানিত হবে, তাদের গোলামে পরিণত হবে, তখন সাহাবারা প্রশ্ন কোরলেন, কি কারণে? বিশ্বনবী (দঃ) জবাব দিয়েছিলেন তারা তখন মৃত্যুভয়ে ভীত হবে [হাদীস-সাওবান (রাঃ) থেকে- আবু দাউদ, মেশকাত]। অন্য কথায় তার (দঃ) ইসলাম(Islam) মৃত্যুর (শাহাদাতের) জন্য পাগল-ভয়ংকর যোদ্ধা সৃষ্টি করতো আর বর্তমানের ইসলাম(Islam) মৃত্যুর ভয়ে ভীত কাপুরুষ সৃষ্টি করে। দু'টি বিপরীত ধর্মী দ্বীন।

৩০। তাকওয়া ও হেদায়াহ

উৎস: Islam and Dajjal
এই বইয়ে আমি দেখাতে চেষ্টা কোরেছি যে চৌদ্দশ’ বছর আগে মহানবী (দঃ) পৃথিবীর মানুষের জন্য যে দ্বীন, জীবন-ব্যবস্থা নিয়ে এসে সমস্ত জীবনের সাধনায় আরবে প্রতিষ্ঠা কোরেছিলেন এবং তার নিজের হাতে গড়া জাতির ওপর সেটাকে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে পৃথিবীময় প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব অর্পণ কোরে আল্লাহ(Allah)র কাছে চলে গিয়েছিলেন, সেই দ্বীনটি আর আজ আমরা যে দ্বীন অনুসরণ করি এই দু’টি দ্বীন শুধু যে একই দ্বীন নয় তাই না, এ দুটি পরস্পর বিরোধী, বিপরীতমুখী দুটো দ্বীন। এই দুইটি দ্বীনের মধ্যে মিল শুধু দৃশ্যঃত বাইরের;ভেতরে এ দু’টি বিপরীতধর্মী। কারা এই সত্য গ্রহণ কোরে সেই প্রকৃত দ্বীন তাদের জীবনে আবার প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা ‘জেহাদ’ কোরবেন, কারা এ সত্য প্রত্যাখ্যান কোরবেন তা আমি জানি না। আমার হাতে হেদায়াতের শক্তি নেই, হেদায়াতের ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ(Allah)র কাছে। তিনি অনুগ্রহ কোরে যাদের হেদায়াত কোরবেন, শুধু তারাই হেদায়াত হবেন আর তিনি যাদের হেদায়াত কোরবেন না, আমার মত লক্ষ মানুষও তাদের সত্য দেখাতে পারবে না। যাই হোক আমার বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে এই বর্তমান পরিচ্ছেদ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

আমাদের বর্তমান বিকৃত আকীদায় আমরা ইসলাম(Islam)কে যে দৃষ্টিতে দেখি তাতে ‘ধর্মকর্ম’ করে না এমন একটি লোককে যদি উপদেশ দিয়ে নামায রোযা করানো যায়, যাকাত দেয়ানো যায়, মিথ্যা পরিহার করানো যায়, সত্য কথা বলানো যায়, এক কথায় সব রকম অন্যায়-মিথ্যাচার থেকে তাকে বাঁচিয়ে পবিত্র জীবন-যাপন করানো যায়, তবে বলা হয় লোকটি হেদায়েত হোয়েছে। ভুল বলা হয়, সে হেদায়াত হয়নি, সে তাকওয়া অবলম্বন কোরেছে অর্থাৎ মুত্তাকী হোয়েছে। হেদায়াতও তাকওয়া দুইটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষ বিরামহীনভাবে চোলতে থাকে। এর এক মুহুর্তও ছেদ নেই, এর ছেদ মানেই মৃত্যু। আর চলা মানেই পথ চোলছে মানেই কোন না কোন পথে চোলছে। সঠিক পথেও চোলতে পারে, ভুল পথেও চোলতে পারে। হেদায়াত অর্থ সঠিক পথে চলা। আল্লাহ(Allah) ও রসুল (দঃ) যে দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন, যে গন্তব্য স্থান নির্দিষ্ট কোরে দিয়েছেন সেই পথে চলা। সেটা কোন পথ? সেটা হলো ‘সেরাতুল মুস্তাকীম' সহজ সরল পথ। ‘সেরাতুল মুস্তাকীম' কী তা পেছনে কিছুটা ব্যাখ্যা কোরেছি। তাকওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে আরও একটু পরিষ্কার করা দরকার। ইবলিস আল্লাহ(Allah)কে চ্যালেঞ্জ করলো যে মাটি দিয়ে তৈরী তোমার খলিফা আদমকে (মানুষ জাতিকে) তোমার দেখানো পথ থেকে বিচ্যুত কোরে তাকে তার নিজের তৈরী করা পথে নিয়ে যাবো যে পথে চলার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হবে মানুষের জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে অশান্তি, অবিচার এবং যুদ্ধ ও রক্তপাত (ফাসাদ ও সাফাকু-দ্দিমা)। আল্লাহ(Allah) ইবলিসের ঐ চ্যালেঞ্জ গ্রহণ কোরলেন এবং তাকে বোললেন, আমি মানুষ জাতির মধ্যে আমার নবী-রসুল পাঠিয়ে এমন পথ দেখাবো- যে পথে চোললে তারা তোমার ঐ অশান্তি-অবিচার, অত্যাচার ও রক্তপাতের মধ্যে যেয়ে পড়বে না। আমার নবী-রসুলদের দেখানো পথে চোললে তারা সুবিচার ও শান্তির মধ্যে বাস কোরবে। এই পথের নাম দিলেন তিনি সেরাতুল মুস্তাকীম; সহজ সরল পথ। এই সহজ সরল পথ কী? এটা হলো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’, আল্লাহ(Allah) ছাড়া আর কোন ইলাহ, বিধানদাতা নেই; উপাস্য নেই, প্রভু নেই, কাজেই আর কারো আদেশ নিষেধ না মানা; জীবনের কোন ক্ষেত্রে আর কারো আইন-কানুন না মানা অর্থাৎ প্রকৃত তওহীদ। আল্লাহ(Allah) তার প্রদর্শিত পথ এত সহজ কেন কোরলেন? এই জন্য কোরলেন যে মানুষ যদি তার আইন, আদেশ নিষেধ ছাড়া অন্য কোন আইন, জীবন-বিধান না মানে তবেই ইবলিস পরাজিত হবে। সে আর মানুষকে অন্য কোন পথে পরিচালিত কোরতে পারবে না এবং মানুষও অশান্তি, অবিচার আর রক্তপাতের মধ্যে পতিত হবে না। কাজেই মানুষ জাতির মধ্যে যারা এই সেরাতুল মুস্তাকীমে চলবে তারা আল্লাহ(Allah)র দলে, অর্থাৎ হেযবুল্লায়, আর যারা আল্লাহ(Allah) ছাড়া অন্য যে কোন জীবন-বিধানকে স্বীকার কোরবে সেটা সম্পূর্ণই হোক বা আংশিকই হোক, তারা ইবলিসের দলে অর্থাৎ হেজবে ইবলিসে। বিকৃত আকীদায় তারা ব্যক্তি জীবনে সারারাত নামায পড়লেও সারা বছর রোযা থাকলেও সেই ইবলিসের দলে। এই সহজ সরলতাকে বোঝাবার জন্য রসুলুল্লাহ (দঃ) বোলেছেন- মানুষের সাথে আল্লাহ(Allah)র চুক্তি (Contract) হোচ্ছে এই যে, মানুষ আল্লাহ(Allah) ছাড়া আর কাউকে ইলাহ বোলে স্বীকার কোরবে না, আল্লাহ(Allah)র পক্ষ থেকে চুক্তি (Contract) হচ্ছে এই যে আল্লাহ(Allah) তাকে জান্নাত দেবেন। এখানে নামায, রোযা, হ্জ্জ ইত্যাদির কোন শর্ত আল্লাহ(Allah) রাখেননি। এই হলো সহজ সরল পথ, সেরাতুল মুস্তাকীম। এই পথে চলা হলো হেদায়েতের পথে চলা, এই হলো আল্লাহ(Allah)র দেয়া দিক-নির্দেশনা।

এখন তাকওয়া। তাকওয়ার অর্থ সাবধানে জীবনের পথ চলা। কোথায় পা ফেলছেন তা দেখে পথ চলা। অর্থাৎ জীবনের পথ চলায় ন্যায়-অন্যায়, ঠিক-অঠিক দেখে চলা, অসৎ কাজ পরিহার কোরে সৎ কাজ কোরে চলা। কোরানের অনুবাদ গুলিতে তাকওয়া শব্দের অনুবাদ করা হোয়েছে, ‘খোদাভীতি' দিয়ে, ইংরেজীতে Fear of God দিয়ে। তাতে প্রকৃত অর্থ প্রকাশ পায় না। কোনটা ন্যায়, কোনটা অন্যায় এর মাপকাঠি আসবে কোথা থেকে? এ মাপকাঠি অবশ্যই আল্লাহ(Allah) ন্যায়-অন্যায়ের যে মাপকাঠি দিয়েছেন সেইটা, অন্য কোন মাপকাঠি নয়। কাজেই সে হিসাবে খোদাভীতি এবং Fear of God শব্দগুলো চলে এবং সেই হিসাবেই তাকওয়া শব্দের অনুবাদ হিসাবে ওগুলো ব্যবহার করা হোয়েছে। ইংরাজী অনুবাদে আল্লামা ইউসুফ আলী অনুবাদ কোরেছেন Fear of God বোলে এবং মোহাম্মদ মারমাডিউক পিকথল কোরেছেন Mindful of duty to Allah অর্থাৎ আল্লাহ(Allah)র প্রতি কর্তব্য সম্বন্ধে চেতনা বোলে। প্রকৃত পক্ষে তাকওয়া শব্দের মর্ম হলো আল্লাহ(Allah) ন্যায়-অন্যায়ের যে মাপকাঠি নির্দিষ্ট কোরে দিয়েছেন, সেই মাপকাঠি মোতাবেক জীবনের পথে চলা। যারা অমন সাবধানতার সঙ্গে পথ চলেন তাদের বলা হয় মুত্তাকী। তাহোলে দেখা যাচ্ছে তাকওয়া ও হেদায়াত দু'টো আলাদা বিষয়। তাকওয়া হোচ্ছে সাবধানে পথ চলা আর হেদায়াত হোচ্ছে সঠিক পথে চলা। আরও পরিষ্কার করার চেষ্টা কোরছি। আপনি আপনার গন্তব্য স্থানের দিকে যেতে দু’ভাবে যেতে পারেন। অতি সাবধানে পথের কাদা, নোংরা জিনিষ এড়িয়ে, গর্ত থাকলে গর্তে পা না দিয়ে, কাঁটার ওপর পা না ফেলে চোলতে পারেন। ওভাবে চোললে আপনার গায়ে ময়লা লাগবে না, আছড়ে পড়ে কাপড়ে কাদামাটি লাগবে না। আবার পথের ময়লা, গর্ত, কাঁটা ইত্যাদির কোন পরওয়া না কোরে সোজা চোলে যেতে পারেন। ওভাবে গেলে আপনি আছাড় খাবেন, গায়ে-কাপড়ে ময়লা কাদামাটি লাগবে। আর হেদায়াত হোচ্ছে আপনি এ উভয়ভাবের যে কোনও ভাবে যেপথে চোলছেন যে পথ সঠিকপথ হওয়া, অর্থাৎ সে পথ আপনাকে আপনার প্রকৃত গন্তব্য স্থানের দিকে নিয়ে যাচ্ছে কিনা। পথ যদি সঠিক না হোয়ে থাকে অর্থাৎ হেদায়াত না থাকে তবে আপনার শত সাবধানে পথ চলা অর্থাৎ শত তাকওয়া সম্পূর্ণ বিফল, কারণ আপনি আপনার গন্তব্যস্থানে পৌঁছবেন না। আর যদি সঠিক পথে অর্থাৎ হেদায়াতে থাকেন ও চলেন তবে তাকওয়া না কোরেও গায়ের কাপড়ে মাদামাটি লাগিয়ে আপনি আপনার গন্তব্যস্থানে পৌঁছে যাবেন আপনি সফলকাম হবেন। অর্থাৎ তাকওয়া অর্থহীন যদি হেদায়াহ না থাকে এবং সেই হেদায়াত সঠিক পথটি হলো সেরাতুল মুস্তাকীম, সহজ সরল পথ, জীবনের কোন ক্ষেত্রে এক আল্লাহ(Allah) ছাড়া কারো বিধান না মানা, তওহীদ। এ জন্যই রসুলাল্লাহ (দঃ) মোয়ায (রাঃ) কে বোললেন, “মোয়ায! কোন লোক যদি মৃত্যু পর্য্যন্ত এক আল্লাহ(Allah)কে ছাড়া আর কাউকে প্রভু বোলে স্থান না দেয়, তবে জাহান্নামের আগুন তাকে স্পর্শ কোরতে পারবে না”। তারপর আবু যর (রাঃ)-কে বোললেন, ‘যে আল্লাহ(Allah) ছাড়া আর কোন প্রভু স্বীকার না করে তবে সে ব্যাভিচার কোরলেও, চুরি কোরলেও, জান্নাতে প্রবেশ কোরবে। অর্থাৎ ঐ লোক সঠিক পথে সেরাতুল মুস্তাকীমে আছে, হেদায়াতে আছে, কিন্তু তাকওয়ায় নেই, সে মুত্তাকী নয়। কিছুই আসে যায় না, কারণ সে সঠিক পথে আছে বোলে সে গায়ে কাদামাটি ময়লা নিয়েও তার গন্তব্য স্থানে, ‘জান্নাতে’ পৌঁছবে আর যারা অতি সাবধানে পথ চোলছেন অতি মুত্তাকি কিন্তু সেরাতুল মুস্তাকীমে ‘হেদায়াতে’ নেই তাদের সম্বন্ধেও আল্লাহ(Allah)র রসুল (দঃ) বোলে গেলেন। বোলেছেন, “ভবিষ্যতে এমন সময় আসছে, যখন মানুষ রোযা রাখবে কিন্তু তা উপবাস অর্থাৎ না খেয়ে থাকা হবে (রোযা হবে না), রাত্রে ওঠে তাহাজ্জুদ নামায পড়বে কিন্তু শুধু তাদের ঘুম নষ্ট করা হবে (নামায হবে না)”। রসুলুল্লাহ যে সময়টার কথা বোলে গেছেন এখন সেই সময়। বর্তমান মুসলিম(Muslim) দুনিয়ার যে উল্লেখযোগ্য অংশটা অতি মুত্তাকি সেটার শুধু ব্যক্তিগত জীবন ছাড়া আর সবটাই অর্থাৎ রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, আইন, দণ্ডবিধি ইত্যাদি সব ক্ষেত্রেই আল্লাহ(Allah)কে বাদ দিয়ে মানুষের তৈরী ব্যবস্থা গ্রহণ ও প্রয়োগ করা হোয়েছে, অর্থাৎ তাওহীদে সেরাতুল মুস্তাকীমে দ্বীনুল কাইয়্যেমাতে ‘হেদায়াতে’ নেই। আদম (আঃ) থেকে শেষনবী (দঃ) পর্য্যন্ত ইসলামের ভিত্তিই হলো তওহীদ, সেরাতুল মুস্তাকীম, দ্বীনুল কাইয়্যেমা। সেখানেই যদি না থাকে তবে আর ইসলামে রইলো কেমন কোরে? কাজেই গোনাহ সওয়াব দেখে দেখে অতি সাবধানে তাকওয়ার সাথে পথ চোললেও সেই পথ তাদের জান্নাতে নিয়ে যাচ্ছে না, নিয়ে যাচ্ছে জাহান্নামে।

এই যে হেদায়াত এবং তাকওয়া দু'টো একেবারে ভিন্ন বিষয়, এটা যদি কেউ মনে করেন আমার ব্যক্তিগত মত তাহোলে তিনি ভুল কোরবেন। এটা আমার কথা নয় সূরা ফাতেহার পর সূরা বাকারা দিয়ে কোরান আরম্ভ কোরেই আল্লাহ(Allah) বোলছেন, "এই বই সন্দেহাতীত। (এটা) মুত্তাকীদের (সাবধানে পথ চলার মানুষদের) জন্য হেদায়াহ (সঠিক পথ প্রদর্শনকারী)"(কোরান- সূরা আল-বাকারা ১)। পরিষ্কার দু'টো আলাদা জিনিস হোয়ে গেলো। একটি তাকওয়া অন্যটি হেদায়াহ। কাজেই আল্লাহ(Allah) বোলছেন, যারা মুত্তাকী, কিন্তু হেদায়াতে নেই- সঠিক পথে নেই, তাদের পথ দেখাবার জন্যই এই কোরান। অন্যান্য, ধর্মে এমন কি আল্লাহ(Allah)কে অবিশ্বাসকারী নাস্তিক কমিউনিষ্টদের মধ্যেও বহু মানুষ আছেন যারা ন্যায়-অন্যায়, ঠিক-অঠিক দেখে জীবনের পথ চোলতে চেষ্টা করেন। তারা মিথ্যা বলেন না, মানুষকে ঠকান না অন্যের ক্ষতি করেন না, যতটুকু পারেন অন্যের ভালো করেন, গরীবকে সাহায্য করেন ইত্যাদি। তারা মুত্তাকী, কিন্তু তারা হেদায়াতে নেই। তাদের হেদায়াতে অর্থাৎ তওহীদে আনার জন্য কোরান। সুরা বাকারা ছাড়াও অন্যত্রও তাকওয়া ও হেদায়াত যে দু'টো ভিন্ন বিষয় তা আল্লাহ(Allah) পরিষ্কার কোরে দিয়েছেন। তিনি বোলছেন- যারা সঠিক পথে (হেদায়াতে) চলে (আল্লাহ(Allah)) তাদের হেদায়াত বৃদ্ধি করেন ও তাদের তাকওয়া প্রদান করেন (কোরান-সূরা মোহাম্মদ- ১৭)। এই আয়াতেও তাকওয়া ও হেদায়াহ যে এক নয়, আলাদা তা দেখা গেলো এবং হেদায়াত তাকওয়ার পূর্বশর্ত (Pre-condition) তাও পরিষ্কার হোয়ে গেলো। তাকওয়া ও হেদায়াহ যে এক নয় তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ হোচ্ছে এই যে, কোরানে বহু জায়াগায় আল্লাহ(Allah) তার রসুলকে বোলছেন, ‘আমি তোমাকে হেদায়াত কোরেছি’। আমি শুধু দু'টি এখানে উল্লেখ কোরছি। সূরা আল ফাতাহ-র দ্বিতীয় আয়াতে আল্লাহ(Allah) তার রসুলকে বোলেছেন, ‘আমি তোমাকে সেরাতুল মুস্তাকীমে হেদায়াত কোরেছি’। তারপর সূরা দুহার সপ্তম আয়াতে তাকে বোলছেন, ‘তোমাকে হেদায়াত কোরেছি’। বর্তমানে প্রচলিত ভুল আকীদায় মুত্তাকী হওয়া মানেই যদি হেদায়াত হওয়া হয় তবে বিশ্বনবীর (দঃ) চেয়ে বড় মুত্তাকী কে ছিলেন, আছেন বা হবেন? আল্লাহ(Allah) নবুয়াত দেবার আগেও যার গোনাহ, পাপ ছিলোনা তাকে আবার হেদায়াত করার দরকার কি? বর্তমান পৃথিবীর মুসলিম(Muslim) জাতির একটা অংশ প্রচণ্ড তাকওয়ায় আপ্রাণ চেষ্টা কোরছেন আল্লাহ(Allah)কে খুশী করার জন্য, তার সান্নিধ্য লাভ করার জন্য, জান্নাতে স্থান পাওয়ার জন্য, কিন্তু চোলছেন আল্লাহ(Allah) ও রসুল (দঃ) যে হেদায়াহ পথ-প্রদর্শন দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন তার ঠিক বিপরীত দিকে। আল্লাহ(Allah)র রসুলের প্রদর্শিত পথের বিপরীত পথ অবশ্যই জাহান্নামের পথ, এ সহজ সত্য তাদের মনমগজে আসছেনা। তারা ওয়াজ কোরছেন- অমুক কাজ কোরলে এত হাজার সওয়াব লেখা হয়; অমুক কাজ কোরলে এত লাখ সওয়াব লেখা হয়। তারা হাওলা দিচ্ছেন যে এসব কথা হাদীসে আছে। হাদীসে ঠিকই আছে। কিন্তু আকীদার বিকৃতিতে তারা বুঝছেননা না যে ওগুলো তাদের উদ্দেশ্যে বলা হোয়েছে যারা সেরাতুল মুস্তাকীমে আছেন, সঠিক পথে আছেন, যাদের আকীদা সঠিক তাদের জন্য। যারা উল্টোপথে আছেন বিপরীত দিকে চোলছেন তাদের জন্য নয়। এই দ্বীনের কঠিনতম দু'টি এবাদত রোযা ও তাহাজ্জুদই যদি তাদের জন্য অর্থহীন হয় তবে ও সব ছোটখাট ব্যাপারগুলো তো প্রশ্নের অতীত। আল্লাহ(Allah)র রসুল (দঃ) জানতেন যে আকীদা ভ্রষ্ট হোয়ে তার উম্মাহ একদিন আল্লাহ(Allah) ও তার প্রদর্শিত দিক-নির্দেশনা থেকে বিচ্যুত হোয়ে উল্টো দিকে চোলতে থাকবে। সেদিন অনেক আগেই এসে গেছে। তিনি ভবিষ্যতবাণী কোরে গেছেন "এমন সময় আসবে যখন মসজিদগুলি মুসল্লী দিয়ে পূর্ণ হবে" এমন কি একটি হাদীসে আছে যে, "এমন পূর্ণ হবে যে সেগুলিতে জায়গা পাওয়া যাবে না, (আজকাল তাই হোয়েছে) কিন্তু সেখানে হেদায়াত থাকবে না।" লক্ষ্য করুন মহানবী (দঃ) কোন শব্দটা ব্যবহার কোরলেন। তিনি তাকওয়া শব্দ ব্যবহার কোরলেন না, ব্যবহার কোরলেন হেদায়াত। অর্থাৎ তাকওয়া থাকবে, খুবই থাকবে, কারণ তাকওয়া না থাকলে তো আর তারা মসজিদ পূর্ণ করতোনা, কিন্তু হেদায়াত থাকবে না। মহানবীর (দঃ) ভবিষ্যতবাণী বহু আগেই পূর্ণতা লাভ করেছে।

নুবয়াত শেষ হোয়ে গেছে। এই উল্টো পথে চলা জাতিকে আবার উল্টিয়ে সঠিক পথে কে আনবে? শেষনবী (দঃ) বোলে গেছেন একজন মাহদী আসবেন ঐ কাজ করার জন্য। মাহদী তার নাম নয়, ওটা তার বিশেষণ বা উপাধি, তার নিজের অন্য নাম থাকবে। লক্ষ্য করুন তার বিশেষণটি কী? মাহদী। শব্দটি এসেছে হেদায়াত থেকে- যিনি হেদায়াত প্রাপ্ত এবং হেদায়াতকারী; সত্যপথপ্রাপ্ত এবং সত্যপথ প্রদর্শনকারী। শেষনবী (দঃ) ভবিষ্যতের সেই মানুষটির উপাধি ও বিশেষণে বোললেন ‘মাহদী', তিনি বোললেন না যে মুত্তাকী আসবেন। কারণ মুত্তাকী আমরা যথেষ্ট, একেবারে চুলচেরা ব্যাপারেও আমরা প্রচণ্ড মুত্তাকী। আমাদের নামায, রোযা, হজ্জ্ব, যাকাত, দাড়ি, মোচ, পাগড়ী, পাজামা, খাওয়া-দাওয়া, তসবিহ যিকরে ভুল ধরে কার সাধ্য? কিন্তু চোলছি সেরাতুল মুস্তাকীমের, দ্বীনুল কাইয়্যেমার ঠিক বিপরীত দিকে, সংগ্রামের বিপরীত দিকে, গর্তের দিকে, পলায়নের দিকে, জাহান্নামের ভয়াবহ আযাবের দিকে। যিনি আমাদের এই জাহান্নামের দিকে গতি উল্টিয়ে আবার জান্নাতের দিকে কোরবেন অর্থাৎ হেদায়াত কোরবেন তার উপাধি, বিশেষণ হোচ্ছে মাহদী (আঃ)।

২৯। জাতি কার্যতঃ মোশরেক ও কাফের

উৎস: Islam and Dajjal
যারা এ বই এই পর্য্যন্ত পড়েছেন, তারা অবশ্যই দেখতে পেয়েছেন, আমি বোলতে চেষ্টা কোরেছি যে আল্লাহ(Allah) যে উদ্দেশ্যে তার শ্রেষ্ঠ নবীর মাধ্যমে দ্বীনুল ইসলাম(Islam)কে মানব জাতির জন্য পাঠিয়েছিলেন এবং যে উদ্দেশ্যে সেই নবী (দঃ) এই উম্মতে মোহাম্মদী সৃষ্টি কোরেছিলেন সেই মহান উদ্দেশ্য বহু পূর্বে হারিয়ে গেছে। আল্লাহ(Allah) ও তার রসুল (দঃ) এই উম্মাহকে যে দিক- নির্দেশনা (Orientation) দিয়ে দিয়েছিলেন তা থেকে এই উম্মাহ বিচ্যুত হোয়ে ঠিক বিপরীত দিকে চোলছে। সুতরাং এই উম্মাহ আর কার্যতঃ মোমেনও নেই, মুসলিম(Muslim)ও নেই, উম্মতে মোহাম্মদীও নেই। এটা এখন একটি পথভ্রষ্ট জনসংখ্যা, যার গত কয়েক শতাব্দীর ইতিহাস হোচ্ছে অপমান, দারিদ্র্য, অশিক্ষা, কুশিক্ষা, শত্রুর হাতে পরাজয় ও খ্রীস্টান পাশ্চাত্য শক্তিগুলির ঘৃণিত গোলামী। এগুলো হোচ্ছে এই দুনিয়ায় আর ঐ দুনিয়ায় অপেক্ষা কোরছে কঠিন আযাব। আমি চেষ্টা কোরেছি হাজার বছরের ফেকাহ, তফসির আর ফতোয়ার পাহাড়ের নিচে যে সহজ-সরল (সেরাতুল মুস্তাকীম) ইসলাম(Islam) চাপা পড়ে রোয়েছে সেই ইসলাম(Islam)কে, সেই দ্বীনুল কাইয়্যেমাকে তার মৌলিক, অনাবিল রূপে উদ্ধার কোরে মানুষের সামনে উপস্থিত কোরতে। জানিনা, পেরেছি কিনা। এক শ্রেণীর মানুষ পৃথিবীতে সব সময় ছিলো, আছে এবং থাকবে যারা সত্য বুঝেও বুঝবে না। এই শ্রেণী বোলবে মুসলিম(Muslim) বোলে পরিচিত এই জনসংখ্যাটির অধিকাংশই কার্যতঃ মোশরেক ও কাফের হয়ে গেছে এ কথা মানি না। তারা হাদীস দেখাবেন- মহানবী (দঃ) বোলেছেন- আমার উম্মাহ সামগ্রিকভাবে পথভ্রষ্টতায় একত্রিত হবে না। এই একটি মাত্র হাদীস ছাড়া তাদের পক্ষে আর কিছুই দেখাতে পারবেন না। এর জবাবে প্রথম কথা হলো এই যে, সমস্ত মোহাদ্দিস ও আলেমগণ একমত যে, শব্দগত ও সূত্রগত (সনদ) উভয় দিক দিয়ে এই হাদীসটি বিশুদ্ধ নয়, অর্থাৎ অত্যন্ত দুর্বল (দয়ীফ), দ্বিতীয়তঃ "সামগ্রীকভাবে" অর্থ যদি এই হয় যে ঐ পথভ্রষ্টতার বাইরে, হেদায়াতে কেউ থাকবে না, সম্পূর্ণ উম্মাহই গোমরাহ হবার কথা বোঝায় তবে ঐ হাদীসটি দূর্বল হোলেও ওটাকে সঠিক বোলে মেনে নিতে রাজী আছি। কারণ, আমি সম্পূর্ণ জাতীটিকেই মোশরেক ও কাফের কখনই বোলছি না, বোলছি বৃহত্তর সংখ্যাগরিষ্ঠের কথা। কারণ সর্ব অবস্থায়, কেয়ামত পর্য্যন্ত একটা জামায়াত বা ফেরকা সত্যের ওপর অটল থাকবে এ কথা বিশ্বনবীই (দঃ) বোলে গেছেন। ঐ ফেরকা হবে ছোট, সংখ্যালঘিষ্ট। এই ছোট জামায়াত বা ফেরকার কথা পেছনে বোলে এসেছি। প্রশ্ন তো বৃহত্তর অংশ অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠের কথা। কিছু সংখ্যক মানুষ সর্ব অবস্থায় গোমরাহীতে, পথভ্রষ্টতায় থাকবে, আল্লাহ(Allah)র রসুলের (দঃ) জীবিত কালেও ছিলো, তাই বোলে সেই জাতিকে পথভ্রষ্ট বলা ভুল হবে অবশ্যই। তার সমস্ত জীবনের সাধনা সাফল্য লাভ কোরেছে কিনা সেই পরীক্ষা করার জন্য যখন তিনি তাবুকের অভিযানের আদেশ দিলেন- তখন আশী জনের মত লোক তাতে যোগ দিলো না। ঐ আশি জন হেদায়াতপ্রাপ্ত হয়নি, কিন্তু ঐ আশি জনের জন্য রসুলুল্লাহকে (দঃ) ব্যর্থ বলা যাবে না। কারণ ত্রিশ হাজার মানুষ তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে পাকা ফসল ত্যাগ কোরে, আগুনের মত মরুভূমির ওপর দিয়ে বহু দুরবর্তী এক পরাশক্তিকে আক্রমণ করার জন্য রওয়ানা হোয়ে গেলো। কিন্তু যদি এমন হতো যে আশিজন লোক তার ডাকে সাড়া দিলো আর কেউ দিলোনা, তবে অবশ্যই বলা যেতো যে মহানবীর (দঃ) জীবনের সাধনা ব্যর্থ। কাজেই প্রশ্ন হোচ্ছে সংখ্যাগরিষ্ঠতার, সংখ্যালঘিষ্ঠতার। যে একটি মাত্র দুর্বল হাদীস দিয়ে এরা নিজেরা যে পথভ্রষ্ট হোয়ে মোশরেক ও কাফেরের পর্য্যায়ে চলে গেছেন তা অস্বীকার করার চেষ্টা করেন সে হাদীসটি সংকলন কোরেছেন আবু মোহাম্মদ আলী ইবনে হাজম এবং কোরেছেন রসুলুল্লাহর (দঃ) সাড়ে চারশ' বছর পর, অর্থাৎ বোখারী, মুসলিম(Muslim) (রঃ) ইত্যাদি মুহাদ্দীসদের বহু পরে, দু'শ বছরেরও পর। আরও লক্ষ্য করার বিষয় হলো এই যে এই ইবনে হাজম স্পেনের অধিবাসী ছিলেন এবং মুসলিম(Muslim) জাহানে স্পেন একমাত্র জায়গা, যেখান থেকে মুসলিম(Muslim) জাতি সমূলে উৎখাত হোয়েছে। আল্লাহ(Allah) এই জাতিকে বোলেছিলেন- তোমরা যদি (পৃথিবীতে আল্লাহ(Allah)র দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য) সামরিক অভিযানে বাহির না হও তবে তিনি তোমাদের মর্মন্তুদ শাস্তি দেবেন এবং অপর জাতিকে তোমাদের স্থলাভিষিক্ত কোরবেন (কোরান- সূরা আত-তওবা- ৩৯)। আরও বোলেছিলেন-"তোমাদের রণ-সম্ভার (অস্ত্রশস্ত্র, রশদ ইত্যাদি) সামান্যই হোক আর বেশীই হোক বাহির হোয়ে পড় এবং তোমাদের প্রাণ ও সম্পদ দিয়ে আল্লাহ(Allah)র পথে জিহাদ কর (কোরান- সূরা আত-তওবা- ৪১)।" আল্লাহ(Allah)র এই সব সরাসরি, দ্ব্যর্থহীন আদেশগুলি (যেগুলি তার নবীর প্রকৃত সুন্নাহ এবং যা ত্যাগ কোরলে তার উম্মাহ হোতে তিনি বহিষ্কার কোরে দিয়েছেন) পরিত্যাগ ও অমান্য করার ফলে আল্লাহ(Allah) তার প্রতিশ্রুতি মোতাবেক এই মুসলিম(Muslim) জাতির হাত থেকে শাসন-শক্তি ছিনিয়ে নিয়ে ইউরোপের খ্রীস্টান জাতিগুলির হাতে সোপর্দ কোরলেন। আল্লাহ(Allah)র এই কাজের দ্বারাই প্রমাণিত হোয়ে গেলো যে তওহীদের ও উম্মতে মোহাম্মদীর দাবীদার এই জাতি তখন আর না মোমেন, না উম্মতে মোহাম্মদী। কারণ আল্লাহ(Allah) কোরানে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে- যারা বিশ্বাস করে ও সৎ কাজ করে (অর্থাৎ মোমেন) তাদের তিনি পৃথিবীর উত্তরাধিকারীত্ব অর্থাৎ শাসন ক্ষমতা দান কোরবেন (কোরান সূরা আন-নূর- ৫৫)। পৃথিবীর উত্তরাধিকারত্ব কি? পৃথিবীর মালিকানা, প্রভূত্ব, শ্রেষ্ঠত্ব। তার প্রতিশ্রুতি মোতাবেক মাত্র কয়েক লাখ মো'মেন, উম্মতে মোহম্মদীর হাতে তিনি তদানিন্তন পৃথিবীর অর্দ্ধেক উঠিয়ে দিয়েছিলেন। আকীদা বিকৃত হয়ো পথভ্রষ্ট হোয়ে জেহাদ ত্যাগ না কোরলে বাকি পৃথিবীও তাদের হাতে সমর্পণ কোরতেন, সন্দেহ নেই। আর আজ ঐ একই জাতি হবার দাবীদার একশ’ত্রিশ কোটি জনসংখ্যাটি পৃথিবীর সব জাতি কর্তৃক অপমানিত, পরাজিত, নিগৃহীত, লাঞ্ছিত। পৃথিবীর অন্যান্য সব জাতি মো'মেন হবার দাবীদার এই জনসংখ্যাকে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে গুলি কোরে হত্যা কোরছে, তাদের বাড়ীঘর জ্বালিয়ে দিচ্ছে, তাদের ধন-সম্পত্তি কেড়ে নিচ্ছে, তাদের মেয়েদের ধর্ষণ কোরছে। তার উম্মতের দাবীদার এই জনসংখ্যার অবস্থার কথা আল্লাহ(Allah)র রসুল (দঃ) ভবিষ্যৎবাণী কোরে গেছেন। বোলেছেন, খাবার পরিবেশন কোরে মানুষকে যেমন খেতে ডাকা হয় তেমনি কোরে পৃথিবীর অন্যান্য জাতি পরস্পরকে ডাকবে মোমেন হবার উম্মতী মোহাম্মদী (দঃ) হবার দাবীদার এই জাতির বিরুদ্ধে (একে পরাজিত, ধ্বংংস করার জন্য) এ কথাও বোললেন যে তখন এই জাতি হবে সংখ্যায় অগণিত এবং সংখ্যায় অগণিত হওয়া সত্ত্বেও পরাজিত অপমানিত নিগৃহিত হবার কারণ বোললেন, তারা স্রোতে ভেসে যাওয়া আবর্জনা হবে [হাদীস- সাওবান (রাঃ) থেকে- আবু দাউদ, মেশকাত]। স্রোতে ভেসে যাওয়া আবর্জনা আর মো'মেন, উম্মতে মোহাম্মদী(দঃ) যদি একই বস্তু হয় তবে বর্তমানের এই জনসংখ্যা যেটা ‘মুসলিম(Muslim)’ বোলে পরিচিত সেটা মোমেন ও উম্মতী মোহাম্মদী।

আল্লাহ(Allah)র তার কোরানে বোলেছেন- হে নবী! সশস্ত্র সংগ্রামে মোমেনদের উদ্বুদ্ধ কর। তোমাদের মধ্যে যদি বিশজন সাবের (দৃঢ়, অটল, অদম্য, সংশপ্তক- ‘সবরের অর্থ' পরিচ্ছেদ দেখুন) থাকে তবে তারা (শত্রুর) দুইশত জনকে পরাজিত কোরবে, এবং তোমাদের যদি একশত জন সাবের থাকে তবে (শত্রুর) এক হাজার জনকে পরাস্থ কোরবে। পরের আয়াতেই আল্লাহ(Allah) এ অনুপাতকে ১:২-তে কমিয়ে দিয়েছেন, মো'মেনদের মানবিক দুর্বলতা লক্ষ্য কোরে। ১:১০ এবং ১:২ এই অনেকখানি তফাতের কারণ হলো ঈমান ও সবরের গভীরতার তফাৎ। সর্বোচ্চ ঈমানের ও সবরের অধিকারীরা এক একজন দশজন শত্রুকে ও সর্বনিম্ন ঈমান ও সবরের অধিকারীরা এক এক জন দুইজন শত্রুকে পরাজিত কোরবে। এর নীচে আর ঈমানের ও সবরের পরিচয় ও অস্তিত্ব নেই। আল্লাহ(Allah)র দেয়া ঐ হিসাব অনুযায়ী বর্তমান ‘মুসলিম(Muslim)’ জাতি সামগ্রিকভাবে মো'মেনের সংজ্ঞায় পড়ে কি? অবশ্যই পড়ে না। যারা ঐ দুর্বল হাদিসটি দেখিয়ে বোলবেন- এই জাতি পথভ্রষ্ট হয়নি, মোমেনই আছে, মুসলিম(Muslim)ই আছে, উম্মতে মোহাম্মদীই আছে তাদের আমি বিশ্বনবীর (দঃ) ঐ হাদীসটি স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যেটায় তিনি ভবিষ্যৎ বাণী কোরেছেন যে তার উম্মাহ তেহাত্তর ভাগে ভাগ হবে যার একটিমাত্র ভাগ হবে জান্নাতী, অর্থাৎ হেদায়াতে, সেরাতুল মুস্তাকীমে থাকবে, আর বাকি বাহাত্তর ভাগই হবে না'রি অর্থাৎ জাহান্নামী, হেদায়াত থেকে পথভ্রষ্ট। সেই সংখ্যাগরিষ্ঠতার, সংখ্যালগিষ্ঠতার কথাই আবার এসে যাচ্ছে। তেহাত্তর ভাগের বাহাত্তর ভাগ কত? শতকরা ৯৮.৬৩%। অর্থাৎ জাতির শতকরা ৯৮.৬৩ জন পথভ্রষ্ট, (প্রকৃতপক্ষে একেবারে বিপরীতগামী) জাহান্নামী এবং এর মাত্র ১.৩৭ জন জান্নাতী। শতকরা ১.৩৭ জন হেদায়াতে আছে বোলে যারা সমগ্র জাতি ‘পথভ্রষ্টতায় একত্রিত’ হয়নি বোলে আত্মপ্রবঞ্চনা কোরবেন তাদের আর আমার বলার কিছু নেই। আসল কথা হলো এই দ্বীনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলিকে ত্যাগ কোরে অনেক কম প্রয়োজনীয় ও অপ্রয়োজনীয় ব্যাপারগুলিকে আঁকড়িয়ে ধরার পর, অর্থাৎ অগ্রাধিকার (Priority) সম্বন্ধে আকীদা বিকৃত হোয়ে যাবার পর নিজেদের সঠিক পথে থাকার প্রমাণের চেষ্টায় যে সব হাদীস তৈরী কোরে নেয়া হোয়েছে সেগুলিকে খুব চালু কোরে দেয়া হোয়েছে। নিজেদের পথভ্রষ্টতা সঠিক প্রমাণের জন্য এরা খুঁজে খুঁজে ঘোর সন্দেহযুক্ত দুর্বল (দয়ীফ) হাদীস খুঁজে বের কোরেছেন (যেগুলো প্রকৃত পক্ষেই সঠিক হাদীস নয়), জেহাদ, সশস্ত্র সংগ্রাম থেকে পালাবার জন্য জেহাদে আকবরের হাদীস খুঁজে বের কোরছেন, নবীর (দঃ) প্রকৃত সুন্নাহ, পৃথিবীতে এই দ্বীনকে প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম থেকে পালাবার জন্য তার দাড়ি-মোচের, খাওয়া-দাওয়ার, কাপড়-চোপড়ের সুন্নাহ খুঁজে বের কোরেছেন। নিজেদের প্রবঞ্চনায় তারা সাফল্য লাভ কোরলেও অবশ্যম্ভাবী পরিণতি থেকে তারা বাঁচতে পারেননি। এই পৃথিবীতে অন্য জাতিগুলির হাতে পিটানি, অপমান, লাঞ্ছনা, ও গোলামী থেকে তারা বাঁচতে পারেন নি, পারছেন না। বিধর্মীরা ভিক্ষা না দিলে না খেয়ে থাকতে হোচ্ছে। তারা এই জাতির মেয়েদের হাজারে হাজারে ধর্ষণ কোরে গর্ভবতী কোরলেও শুধু চিৎকার করা ছাড়া আর কিছুই করার সাধ্য নেই। যদি এই জনসংখ্যা, যেটা নিজেদের মুসলিম(Muslim) বোলে মনে কোরে আহাম্মকের স্বর্গে বাস কোরছে, এখনও এটার চলার পথের দিক পরিবর্তন কোরে আল্লাহ(Allah)-রসুলের (দঃ) দিক-নির্দেশনায় (Orientation), অর্থাৎ সেরাতুল মুস্তাকীমে, প্রকৃত তওহীদ ও জেহাদের পথে ফিরে না আসে তবে অদূর ভবিষ্যতে অপেক্ষা কোরছে বর্তমানের চেয়েও ভয়াবহ অবস্থা এবং আখেরাতে ভয়ংকর শাস্তি। মুসলিম(Muslim), মো'মেন ও উম্মতে মোহম্মদী বোলে পরিচিত বর্তমানের এই জনসংখ্যাকে আমি এই বইয়ে কার্যতঃ মোশরেক ও কাফের বোলে আখ্যায়িত কোরেছি। কোন সন্দেহ নেই যে এই জনসংখ্যার একটি বিশেষ অংশ, যে অংশটি আল্লাহ(Allah) ও তাঁর রসুল (দঃ) বারবার সতর্কীকরণ সত্ত্বেও দ্বীন নিয়ে বাড়াবাড়ি কোরে সেটাকে ধ্বংস কোরে দিয়েছেন, নিজেরা অতি মুত্তাকী হোয়েছেন, কিন্তু চোলছেন আল্লাহ(Allah)-রসুলের দিক নির্দেশনার ঠিক বিপরীত দিকে, সেই অংশটি অত্যন্ত চটে যাবেন আমার ওপর। তাদের কাছে আমি সবিনয়ে কয়েকটি কথা নিবেদন কোরতে চাই। (ক) মো'মেন জাতির কাছে আল্লাহ(Allah) প্রতিশ্রুতিবদ্ধ তাদের সর্বাবস্থায় সাহায্য করার জন্য (কোরান- সূরা আর-রুম- ৪৭)। শুধু সাহায্য করার নয় তাদের হাতে পৃথিবীর কর্তৃত্ব উঠিয়ে দেবার (কোরান সূরা আন-নূর- ৫৫)। যদি দেখা যায় যে মো'মেন হবার দাবিদার জাতিটির হাতে পৃথিবীর কর্তৃত্ব তো নেইই বরং সে জাতি অন্যান্য জাতির দাসত্ব কোরেছে এবং কোরছে, অন্যান্য জাতিগুলি পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে এই জাতির মানুষগুলোকে অপমান কোরছে, লাঞ্ছিত কোরছে, তাদের গুলি কোরে, আগুনে পুড়িয়ে, বেয়নেট কোরে, ট্যাংকের তলায় পিষে হত্যা কোরছে, তাদের মেয়েদের নিয়ে যাচ্ছে, তাদের ধর্ষণ কোরে হাজারে হাজারে গর্ভবতী কোরছে, তবে দু’টি সিদ্ধান্তের একটি সিদ্ধান্ত অবশ্যই নিতে হবে। হয় আল্লাহ(Allah) তার প্রতিশ্রুতিপালন কোরছেন না, বা কোরতে অক্ষম, আর না হয় মো'মেন হবার দাবীদার এই জনসংখ্যা মো'মেন নয়। যেহেতু আল্লাহ(Allah) তার প্রতিশ্রুতিপালন কোরতে ব্যর্থ, এটা অসম্ভব-কাজেই মো'মেন দাবীদার এই জনসংখ্যা মো'মেন নয় এবং মো'মেন নয় মানে অবশ্যই মোশরেক ও কাফের। অন্য সিদ্ধান্ত অসম্ভব। (খ) মহানবী (দঃ) কোরানের আয়াতগুলির কোনটার অর্থ, ব্যাখ্যা নিয়ে মতভেদ, তর্কাতর্কিকে কুফর বোলে ঘোষণা দিয়েছেন। তার জীবিতকালে তার সাহাবাদের মধ্যে কোরানের আয়াতের অর্থ নিয়ে কোন মতভেদ, তর্ক হয়নি, ফেকাহ নিয়ে আলাদা আলাদা দল (মযহাব) গঠন তো চিন্তার বাইরে। কোন সন্দেহ নেই যে কেউ ও রকম কোন চেষ্টা কোরলে তিনি তাকে হত্যা করার হুকুম দিতেন। তার ওফাতের বহু পরে যখন ঠিক ঐ কাজটাই করা শুরু হলো, তখন ওটা শুধু যে কুফর হলো তাই নয়, ওটা বেদাত অর্থাৎ শেরকও হলো, কারণ মহানবীর (দঃ) সময় ওটা ছিলো না। সেই তখন থেকে ঐ কুফর, বেদা’ত ও শেরক কাজ আজ পর্য্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে চোলে আসছে। শুধু চোলে আসছে না বিকৃত ও বিপরীত আকীদার ফলে ঐ শেরক ও কুফর মহা সওয়াবের, পূণ্যের কাজ মনে কোরে করা হোচ্ছে। যে জাতি বা জনসংখ্যা হাজার বছরেরও বেশী সময় ধোরে শেরক ও কুফর কোরে আসছে সেটাকে কার্যতঃ কাফের ও মোশরেক বলায় ভুল কোথায়? (গ) পৃথিবী থেকে বিদায় নেবার সময় হোলে বিশ্বনবী (দঃ) বিদায় হজ্জে তার উম্মাহকে সেই সব ব্যাপারে সাবধান কোরে দিয়েছিলেন যে সব ব্যাপারে তার অবর্তমানে উম্মাহর ভুল করার সম্ভাবনা ছিলো। সেই সব ব্যাপারগুলির মধ্যে একটি ছিলো নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব, সংঘর্ষ অর্থাৎ অনৈক্য। বোলেছিলেন- এই দিন (হজ্জের দিন), এই মাস(জিল হজ্জ) ও এই স্থানের (মক্কা ও আরাফাতের ময়দান) পবিত্রতা একত্র কোরলে যতখানি পবিত্রতা জমা হয়, তোমাদের একের জন্য অন্যের জীবন, সম্পদ ও সম্মান ততখানি পবিত্র (হারাম)। সাবধান! সাবধান! আমার (ওফাতের) পর তোমরা একে অন্যকে হত্যা কোরে কুফরী কোরো না। আল্লাহ(Allah)র রসুল (দঃ) তার জাতির উদ্দেশ্যে এই সাবধান বাণী একবার নয়, বারবার উচ্চারণ কোরেছিলেন। লক্ষ্য করুন, অনৈক্য, নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব সংঘর্ষকে মহানবী (দঃ) কী বোলেছেন! একে তিনি বোলছেন কুফর। এ ইতিহাস কি কেউ অস্বীকার কোরতে পারবে যে বিশ্বনবীর (দঃ) ওফাতের কিছু পর থেকেই এই জাতি নিজেদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হোয়ে পড়েছিলো এবং পরবর্তীতে বহু মযহাবে ও ফেরকায় বিভক্ত হোয়ে গিয়েছে এবং তারপর ঐ মহাপাপের শাস্তি হিসাবে আল্লাহ(Allah) যখন এটাকে ইউরোপের খ্রীস্টান শক্তিগুলির গোলাম, দাস বানিয়ে দিলেন তখন এই জনসংখ্যা তাদের প্রভুদের রাষ্ট্রনীতি নকল কোরে চল্লিশটিরও বেশী ভৌগলিক রাষ্ট্রে বিভক্ত হোয়ে কুফরীর যা কিছু বাকি ছিলো সেটুকুও পূরণ করলো। কাজেই মুসলিম(Muslim) বোলে পরিচিত এবং অজ্ঞানতার (জাহেলিয়াতের) অন্ধকারে বোসে প্রচুর এবাদতকারী এই জনসংখ্যাকে কার্যতঃ কাফের আমি বোলছিনা, আল্লাহ(Allah)র রসুল (দঃ) বোলে গেছেন, আমি শুধু উল্লেখ কোরছি। (ঘ) এতো গেলো যুক্তির কথা। এবার প্রমাণ। আল্লাহ(Allah) তার কোরানে বোলছেন- কাফেরদের দোয়া নিস্ফল, ব্যর্থ (কোরান- সূরা আর-রা’দ- ১৪, সূরা আল-মো'মেন- ৫০)। অর্থাৎ আল্লাহ(Allah) বোলছেন কাফেররা যা দোয়া করে, যা চায় আল্লাহ(Allah) তা মঞ্জুর করেন না। গত শত শত বছর ধোরে এই জাতি কি কি দোয়া কোরে আসছে? একটা হলো- হে আমাদের রব! আমাদের এই দুনিয়াকে সুন্দর কোরে দাও এবং আমাদের পরজীবনকে সুন্দর করে দাও (কোরান-সূরা আল-বাকারাহ- ২০১)। এই দোয়ার ফল কি বোলে দিতে হবে? কয়েক শতাব্দীভর খ্রীস্টানদের দাসত্ব এবং তারপর এখন আরও ঘৃণ্য অবস্থা। পৃথিবীর সর্বত্র পরাজয়, অপমান, নিগ্রহ, তো আছেই তার ওপর অন্যান্য প্রতিটি জাতি এই জাতি বা জনসংখ্যার মানুষদের হত্যা কোরছে, তাদের বাসস্থান জ্বালিয়ে পুড়িয়ে সেখান থেকে বের কোরে দিচ্ছে, তাদের মেয়েদের ধোরে ধোরে ধর্ষণ কোরে হাজারে হাজারে গর্ভবতী কোরছে, ট্যাংকের তলায় পিষে মারছে। একশ’ ত্রিশ কোটি সংখ্যার জাতিটিকে পৃথিবীর অন্য কোন জাতিই এতটুকুও পরওয়া কোরছে না, অবজ্ঞা, বিদ্রুপ কোরছে। এই দুনিয়াকে সুন্দর করার দোয়ার ঠিক বিপরীত ফল। আর যাদের এই দুনিয়া এই রকম তাদের ঐ দুনিয়া অর্থাৎ আখেরাতেও তাই, কঠিন আযাব। এই জাতি দোয়া করছে, মসজিদে-মসজিদে, মজলিসে, এজতেমায়, মিটিংয়ে, দোয়া করছে- আল্লাহ(Allah) আমাদের প্রথম কেবলা বায়তুল মোকাদ্দেস ইহুদীদের হাত থেকে উদ্ধার কোরে দাও। ফল কি হোচ্ছে? ইসরাইল রাষ্ট্র আয়তনে আরও বড় হোচ্ছে, ত্রুমশঃ আরও শক্তিশালী হোচ্ছে। এই জাতির ঐক্যের জন্য দোয়া করা হোচ্ছে এবং যতই করা হোচ্ছে ঐক্য ততই ভাঙ্গছে। এই জাতির শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য, শত্রুর বিরুদ্ধে জয়ের জন্য (আলা কওমেল কাফেরিন), এক কথায় এই জাতি আল্লাহ(Allah)র কাছে যা কিছুর জন্য দোয়া কোরে যাচ্ছে, হিসাব কোরে দেখুন তার প্রত্যেকটার উল্টো ফল হোচ্ছে। ইরাক এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধের সময় খ্রীস্টান পাশ্চাত্যের তাবেদার পশ্চিম এশিয়ার আরব রাজতন্ত্র ও আমীরতন্ত্রের রাষ্ট্রগুলি ছাড়া বাকি মুসলিম(Muslim) দুনিয়া ইরাকের জয়ের জন্য আল্লাহ(Allah)র কাছে প্রাণপণে দোয়া কোরেছে, লক্ষ লক্ষ লোক নামায, রোযা মানত কোরেছে। ফল কি হোয়েছে? সেই বিপরীত ফল হোয়েছে, আল্লাহ(Allah) ইরাককে লজ্জাকর পরাজয় দিয়েছেন। কারণ যারা দোয়া কোরেছিলো এবং যাদের জন্য দোয়া করা হোচ্ছিলো দু'টোর কোনটাই মো'মেন নয়, এবং মো'মেন নয় অর্থই মোশরেক এবং কাফের। জাতি মো'মেন হোলে, কার্যতঃ মোশরেক ও কাফের না হোলে উপসাগরীয় যুদ্ধের অবস্থাই সৃষ্টি হতো না।

আল্লাহ(Allah) কোরানে বোলছেন- কাফেরদের দোয়া নিস্ফল ও ব্যর্থ। অর্থাৎ তাদের দোয়া আল্লাহ(Allah) শুনবেন না, কোন ফল হবে না। তা হোলে যে জাতি বা জনসংখ্যার দোয়া, মানত তিনি যে শুধু শুনছেন না তাই না, যা যা দোয়া করা হোচ্ছে সেগুলোর ঠিক বিপরীত ফল দিচ্ছেন সে জাতি বা জনসংখ্যা কি?

২৮। জেহাদে আকবর

উৎস: Islam and Dajjal
সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে সমস্ত পৃথিবীতে আল্লাহর(Allah) সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা কোরে ইবলিসের চ্যালেঞ্জে আল্লাহকে(Allah) জয়ী করা ও মানব জাতির মধ্যকার সমস্ত অন্যায়-অবিচার দূর কোরে শান্তি (ইসলাম) প্রতিষ্ঠার বর্হিমুখী প্রচেষ্টা অর্থাৎ বিশ্বনবীর (দঃ) প্রকৃত সুন্নাহ ত্যাগ কোরে এই জাতি যখন উম্মতে মোহাম্মদী থেকে বহিষ্কৃত হলো অর্থাৎ আত্মহত্যা করলো, তখন আত্ম-প্রবঞ্চনার জন্য প্রকৃত সুন্নাহর বিকল্প হিসেবে নেয়া হলো তার ব্যক্তিগত অভ্যাসের পছন্দ-অপছন্দের বিষয়গুলি যার সঙ্গে তার জীবনের মূখ্য উদ্দেশ্যের কোন সম্বন্ধ ছিলো না। তিনি অনুসরণের আদেশ দিয়েছেন তার সংগ্রামী চরিত্রের, তার অসমাপ্ত কাজকে সমাপন করার। সশস্ত্র সংগ্রাম, জেহাদ ছেড়ে দিয়ে বিকল্প হিসাবে বের করা হলো জেহাদে আকবরকে, নফসের সাথে জেহাদকে। প্রচার করা হলো মহানবী (দঃ) বোলেছেন নফসের সঙ্গে, আত্মার কু-প্রবৃত্তির সঙ্গে যুদ্ধ হোচ্ছে জেহাদে আকবর। উদ্দেশ্য হলো তোমরা সশস্ত্র সংগ্রাম ছেড়ে দিয়ে ঘরে, হুজরায়, খানকায় বোসে নফসের সঙ্গে সংগ্রাম করো, বিশ্বনবী (দঃ) আল্লাহর(Allah) আদেশে সমগ্র পৃথিবীতে এই দ্বীনুল কাইয়্যেমাকে প্রতিষ্ঠার জন্য যে সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু কোরে এবং পরে তা তার উম্মাহর ওপর অর্পণ কোরেছিলেন, তা ছেড়ে দিয়ে ঘরে ফিরে যাও, তিনি তার উম্মাহর হাতে যে অস্ত্র ধরিয়ে দিয়েছিলেন, ওটা ফেলে তসবিহ হাতে নাও। জাতির, উম্মাহর আকীদা আগেই বিকৃত হোয়ে গিয়েছিলো, প্রকৃত জ্ঞান লুপ্ত হোয়ে গিয়েছিলো, তাই উম্মাহ ঐ ডাকে সাড়া দিলো এবং হাতের অস্ত্র ফেলে তসবীহ উঠিয়ে খানকায় ঢুকলো। আল্লাহর(Allah) রসুলের (দঃ) ওফাতের পর তার উম্মাহ যখন অস্ত্র হাতে আরব থেকে উত্তাল মহা-তরঙ্গের মত বের হোয়ে বিশাল পৃথিবীর বুকে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো তখন এই দ্বীনের শত্রুরা যদি ঐ জেহাদে আকবরের দোহাই দিয়ে এই উম্মাহকে অস্ত্র ফেলে আরবে ফিরিয়ে দিতে পারতো, তবে কী হতো? তবে আজ যারা জেহাদে আকবর নিয়ে খুব ব্যস্ত আছেন তারা গলায় ক্রশ ঝুলিয়ে গীর্জায় যেতেন, কিম্বা নামাবলি গায়ে দিয়ে কপালে চন্দন লাগিয়ে মূর্তিপূজা কোরতেন, না হয় গেরুয়া বসন পরে প্যাগোডায় বোসে ‘বুদ্ধং শরণং গচ্ছামী- সংঘং শরণং গচ্ছামী’ জপতেন। সৌভাগ্যক্রমে রোমান এবং পারসীয়রা ঐ ‘হাদীস’ গুলো জানতোনা। অবশ্য জানলেও কোন লাভ হোতো না, কারণ ঐ উম্মতে মোহাম্মদীর আকীদায় তখন কোন বিকৃতি আসেনি, তারা তখনও প্রকৃত উম্মতে মোহাম্মদী। তারা জানতেন তারা কী কোরছেন এবং কেন কোরছেন, কোন ছেঁদো কথায় ভুলবার পাত্র তারা ছিলেন না। কিন্তু পরবর্তী সময়ে আকীদায় যখন ফাটল ধরলো- বিকৃতি এলো, তখন সশস্ত্র সংগ্রাম ত্যাগ করা হলো, জাতি প্রকৃত উম্মতে মোহাম্মদী থেকে বহিস্কৃত হলো এবং সশস্ত্র সংগ্রামের বিকল্প হিসাবে জেহাদে আকবরকে আবিষ্কার করা হলো।

এখন দেখা যাক এই আবিষ্কারের ভিত্তি কতটুকু শক্ত। জেহাদে আকবরের আবিষ্কারকরা মাত্র তিনটি হাদীসের উল্লেখ কোরতে পেরেছেন যেগুলোতে নাফসের সাথে সংগ্রামকে রসুলুল্লাহ (দঃ) নাকি জেহাদে আকবর বোলে অভিহিত কোরেছেন। এগুলির একটি বর্ণনা কোরেছেন ইবনে নাজ্জার, একটি দায়লামি ও তৃতীয়টি খতিব। সমস্ত মুহাদ্দিসগণ এক বাক্যে ঐ তিনটি হাদীসকে দুর্বল অর্থাৎ দয়ীফ বোলে রায় দিয়েছেন। হাফেয ইবনে হাজারের মত বিখ্যাত মুহাদ্দীস ঐ হাদীসগুলোক হাদীস বোলেই স্বীকার করেন নি। বোলেছেন নফসের সঙ্গে যুদ্ধ জেহাদে আকবর, এটা হাদীসই নয়। এটি একটি আরবী প্রবাদ বাক্য মাত্র (তাশদীদ উল কাভেস- হাফেয ইবনে হাজার)। এতো গেলো একটি দিক, অন্য দিকটি হোচ্ছে এই যে-হাদীস সত্য কি মিথ্যা তা যাচাই করার অন্যতম প্রধান সূত্র হোচ্ছে কোরান। কোন হাদীস যদি কোরানের অভিমতের সঙ্গে সামঞ্জস্য না থাকে বা বিরোধী হয় তবে সে হাদীস বাতিল বোলে পরিত্যাগ করা হয়। রসুলুল্লাহ (দঃ) মাপকাঠি নির্দিষ্ট কোরে দিয়েছেন এই বোলে যে, আল্লাহর(Allah) বাণী আমার বানীকে বাতিল ‘রদ' কোরবে, কিন্তু আমার বাণী আল্লাহর(Allah) বাণীকে বাতিল কোরবে না। এই আলোকে দেখা যাক এই ব্যাপারে আল্লাহ(Allah) স্বয়ং কী বোলছেন। তিনি বোলছেন কাফেরদের কথা শুনোনা, মেনোনা, এবং তাদের বিরুদ্ধে কঠোর, চূড়ান্ত সংগ্রাম চালিয়ে যাও (কোরান- সূরা আল- ফোরকান- ৫২)। এখানে আল্লাহ(Allah) যে শব্দ ব্যবহার কোরছেন তা হলো "জেহাদান কবীরা"। কবীর এবং আকবর দু'টো শব্দ একই মূল থেকে এসেছে এবং একই অর্থ বহন করে। অর্থাৎ আল্লাহ(Allah) বোলছেন জেহাদে কবীর বা আকবর হোচ্ছে কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা, আর এরা বোলছেন না তা নয়, জেহাদে আকবর হোচ্ছে নফসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা। অর্থাৎ আল্লাহর(Allah) বাণীকেই একেবারে উল্টিয়ে দিচ্ছেন। এ গেলো কোরানে আল্লাহর(Allah) কথা। এবার তার রসুল(দঃ) এ ব্যাপারে কী বোলছেন দেখা যাক। তাকে প্রশ্ন করা হলো- কোন জেহাদ সর্বোত্তম, সর্বশ্রেষ্ঠ (ফদল)? তিনি জবাব দিলেন- প্রাণ এবং সম্পদ দিয়ে মোশরেকদের বিরুদ্ধে জেহাদ করা [হাদীস-আব্দুল্লাহ বিন হাবশী (রাঃ) থেকে আবু দাউদ, নেসায়ী, মেশকাত]। কোরানে আল্লাহর(Allah) বাণীরই প্রতিধ্বনি। আল্লাহর(Allah) ও তার রসুলের (দঃ) কথাকে উল্টিয়ে দিয়ে সশস্ত্র সংগ্রামের মরতবা ও পুরস্কারের হাজার হাজার সহি হাদীসের বিরুদ্ধে দুই তিনটি দুর্বল হাদীস বা প্রবাদকে দাঁড় কোরিয়ে এই যে নাফসের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে প্রাধান্য দেয়া এর আসল কারণ কী?

এর প্রকৃত কারণ বোলতে গেলে আবার ইতিহাসের খানিকটা পুনরাবৃত্তি কোরতে হোচ্ছে। আল্লাহ(Allah) ইবলিসের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ কোরলেন, ইবসিলের প্রার্থনা মোতাবেক তাকে ও তার সহযোগীদের আদমের অর্থাৎ মানুষের দেহ-মনের মধ্যে ঢুকে তাকে কু-পরামর্শ দেবার শক্তি দিলেন, অন্যদিকে তিনি তার নবী-রসুল পাঠিয়ে মানুষকে পথ-প্রদর্শন বা দিক-নির্দেশনা কোরলেন। এই পথ-প্রদর্শন অর্থাৎ দিক-নির্দেশনা হলো হেদায়াহ। এই হেদায়াহ কী? এই হেদায়াত হোচ্ছে আল্লাহর(Allah) ওয়াহদানীয়াত, তওহীদ, এক আল্লাহ(Allah) ছাড়া আর কাউকে বিধানদাতা বোলে স্বীকার না করা, জীবনের কোন স্তরে বা ভাগে তার দেয়া আইন-কানুন ছাড়া আর করো আইন-কানুন স্বীকার না করা। শুধু তাই নয়, ঐ সঙ্গে দিলেন এমন একটি জীবন-ব্যবস্থা যেটা পূর্ণাঙ্গ অর্থাৎ মানুষের জীবনের প্রতিটি অঙ্গনে যত সমস্যা হোতে পারে তার ভারসাম্যযুক্ত সমাধান, নিখুঁত সমাধান। কিন্তু যত নিখুঁতই হোক ঐ জীবন-ব্যবস্থা যদি মানুষ গ্রহণ না করে, নিজেরাই নিজেদের জন্য আইন-কানুন-জীবন-ব্যবস্থা- তৈরী কোরে নেয় বা ওটাকে ব্যক্তিজীবনের ছোট্ট পরিধির মধ্যে সীমিত কোরে রাখে তাহোলে অত নিখুঁত জীবন ব্যবস্থা অর্থহীন হোয়ে থাকবে, মানুষের তৈরী জীবন-ব্যবস্থা অনুসরনের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হিসাবে মানব জাতির মধ্যে অন্যায়-অবিচার-রক্তপাত হোতে থাকবে, শয়তান জয়ী হবে। তাই আল্লাহ(Allah) শেষ নবীকে (দঃ) পাঠালেন এই দায়িত্ব দিয়ে যে তিনি যেন সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে এই জীবন-ব্যবস্থা, এই সংবিধান অর্থাৎ দ্বীন সমস্ত মানব জাতির ওপর কার্যকরী করেন। এক জীবনে এত বিরাট-বিশাল কাজ সম্ভব নয় বোলে বিশ্বনবী (দঃ) একটি জাতি গঠন কোরলেন। প্রেরণা-প্রেষণা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ঐ জাতিকে একটি দুর্দ্ধর্ষ যোদ্ধা জাতিতে পরিণত কোরলেন। তিনি এমন জাতি সৃষ্টি কোরলেন যে জাতির সর্বপ্রধান চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যই হলো শুধু মৃত্যুভয়হীনতা নয়, যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত্যুর জন্য ব্যাগ্র আকুলতা। তার (দঃ) নিজের ওপর আল্লাহর(Allah) দেয়া দায়িত্ব এই নতুন যোদ্ধা জাতির ওপর অর্পণ কোরে বিশ্বনবী (দঃ) তার প্রভুর কাছে চলে গেলেন। বোলে গেলেন সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে এই দ্বীন সমস্ত পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম অর্থাৎ তার সুন্নাহ যে বা যারা ত্যাগ কোরবে, তারা তার কেউ নয়, অর্থাৎ তার জাতি উম্মাহ থেকে বহিষ্কৃত। অর্পিত দায়িত্ব সম্পর্কে সজাগ জাতি তাদের নেতার ওফাতের পর সমস্ত পার্থিব সম্পদ কোরবান কোরে উত্তাল মহাতরঙ্গের মত পৃথিবীর বুকে গড়িয়ে পড়ে অর্দ্ধেক পৃথিবীতে দ্বীন প্রতিষ্ঠা কোরেছিল, এটা ইতিহাস। কিন্তু তারপরই ঐ মহাজাতি করলো সর্বনাশা কাজ। হঠাৎ তারা ভুলে গেলো তাদের ওপর আল্লাহ(Allah) ও তার রসুলের (দঃ) অর্পিত দায়িত্ব। আকীদা নষ্ট বা ভুল হোলে যে ঈমান অর্থহীন হোয়ে যায় এবং ঈমান অর্থহীন হোলে যে ঈমান ভিত্তিক নামায, রোযা, হজ্ব, যাকাত সব কিছুই অর্থহীন হোয়ে যায় এ উপলব্ধিও আর রোইলনা। তারা সেই সশস্ত্র সংগ্রাম ত্যাগ করলো, তাদের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হারিয়ে গেল, তাদের আকীদা নষ্ট হোয়ে গেলো।

তখন একটা সমস্যা দেখা দিলো। সেটা হলো এই যে জেহাদ সর্ব অবস্থায় ওয়াজেব এবং বিশেষ অবস্থায় ফরদে আইন, নামায, রোযা, হজ্ব, যাকাতের মতই ফরদে আইন, এ কথায় কোন মযহাবের কোন ইমামের মতভেদ নেই। জেহাদ ছেড়ে দেয়া হোয়েছে, জাতিগত ভাবে ছেড়ে দেয়া হোয়েছে, অথচ ওটা ওয়াজিব এবং ফরদ। যেটা ওয়াযেব এবং ফরদে আইন সেটা ছেড়ে দিয়ে মুসলিম থাকা যায় কেমন কোরে? এই বিপদ থেকে উদ্ধার পাবার জন্য আবিষ্কার করা হলো জেহাদে আকবরকে; নফসের সঙ্গে যুদ্ধ করাকে। একটা প্রবাদ বাক্যকে হাদীসের মর্যাদা দেবার চেষ্টা করা হলো পলায়নপর মনোবৃত্তিকে সমর্থন করার জন্য। শুধু তাই নয় আল্লাহর(Allah) রসুল (দঃ) যে বোলেছিলেন যে "যারা আমার সুন্নাহ ত্যাগ কোরবে তারা আমাদের কেউ নয়" এই হাদীস থেকে বাঁচবার চেষ্টায় তারা ঘোষণা কোরলেন, এ সুন্নাহ মহানবীর (দঃ) সশস্ত্র সংগ্রাম নয়, ঐ সুন্নাহ হোচ্ছে তার ব্যক্তি জীবনের অভ্যাস, কাপড়-চোপড়, খাওয়া-দাওয়ার তার পছন্দ-অপছন্দ, তার চুল, দাড়ি, মোচ তার দাঁত মাজা, তার খাওয়ার আগে একটু লবণ মুখে দেয়া, খাওয়ার পর একটু মিষ্টি খাওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি। মানব জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ বিপ্লবীর জীবন থেকে তারা শিক্ষা বেছে নিলেন ঐগুলি। দু'টো কাজেরই মুল উদ্দেশ্য হলো পলায়ন- কাপুরুষতা, মৃত্যু-শাহাদাত থেকে পলায়ন। যে শাহাদাতের কথা বোলতে যেয়ে এরা যার সুন্নাহ পালন করেন বোলে দাবী করেন, সেই বিশ্বনবী (দঃ) বোলেছেন আমার ওপর নবুয়াতের দায়িত্ব না থাকলে আমি জেহাদের ময়দানে শহীদ হোয়ে যেতাম, বোলেছেন আমি কেমন আকুলভাবে চাই যে কত ভালো হোত, যদি আমি শহীদ হতাম, আমাকে জীবিত করা হোত, আমি আবার শহীদ হতাম, আমাকে আবার জীবিত করা হোত, আবার শহীদ হতাম, আবার জীবিত করা হোত এবং আবার শহীদ হতাম [হাদীস- আবু হোরাইরা(রাঃ) থেকে বোখারী মুসলিম মেশকাত]। তার উম্মাহর ভবিষ্যত সম্বন্ধে বোলতে যেয়ে রসুলুল্লাহ (দঃ) একদিন বোললেন-"শীঘ্রই এমন দিন আসছে যে অন্যান্য জাতিসমূহ এই উম্মাহর বিরুদ্ধে একে অপরকে ডাকবে যেমন কোরে (খানা পরিবেশন করার পর) একে অন্য সবাইকে খেতে ডাকে।" তাকে প্রশ্ন করা হলো "আমরা কি তখন সংখ্যায় এত নগণ্য থাকবো?" তিনি বোললেন, "না, তখন তোমরা সংখ্যায় অগণ্য হবে, কিন্তু হবে স্রোতে ভেসে যাওয়া আবর্জনার মত। আল্লাহ(Allah) তোমাদের শত্রুর মন থেকে তোমাদের সম্পর্কে ভয়-ভীতি উঠিয়ে নেবেন এবং তোমাদের হৃদয়ের মধ্যে দুর্বলতা নিক্ষেপ কোরবেন।" কেউ প্রশ্ন কোরলেন, "ইয়া রসুলুল্লাহ! এই দুর্বলতার কারণ কি হবে? " তিনি জবাব দিলেন, "দুনিয়ার প্রতি ভালবাসা ও মৃত্যুর প্রতি অনীহা [হাদীস- সাওবান (রাঃ) থেকে আবু দাউদ, মেশকাত। ইরাকের বিরুদ্ধে পৃথিবীর জাতিগুলিকে কেমন কোরে ডাকা হোয়েছিল স্মরণ করুন। অবশ্য এ কথার মানে এ নয় যে ইরাক প্রকৃত উম্মতে মোহাম্মদী। ইরাক যেমন প্রকৃত উম্মতে মোহাম্মদী নয় তেমনি যে সব ‘মুসলিম' জাতি খ্রীস্টান ও ইহুদীদের পক্ষ হোয়ে ইরাককে আক্রমণ কোরে ধ্বংস কোরেছিল সেগুলোও নয়]।" যে জাতির স্রষ্টা যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত্যুর জন্য বারবার আকুল আগ্রহ প্রকাশ কোরেছেন, যে জাতির অবিশ্বাস্য সামরিক বিজয়ের কারণ হিসেবে পাশ্চাত্য ইতিহাসবেত্তারা লিখেছেন Utter contempt for death মৃত্যুর প্রতি চরম অবজ্ঞা, সেই জাতি মৃত্যুভয়ে ভীত হোয়ে যাবার কারণই হলো সশস্ত্র সংগ্রামকে ছেড়ে বিকল্প হিসাবে নফসের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে গ্রহণ করা এবং নেতার প্রকৃত সুন্নাহ-সশস্ত্র সংগ্রামকে ছেড়ে তার জীবনের লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্যের সঙ্গে সম্পর্কহীন ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ, অভ্যাস ইত্যাদির অনুকরন করা। আদম (আঃ) থেকে আজ পর্য্যন্ত মানব জাতির মধ্যে ছোট বড় যত নেতা জন্মেছেন, কোন নেতাকেই তার জাতি এমন অপমানকর অবমূল্যায়ন কোরেছে বোলে আমার মনে হয় না, যেমন কোরে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বিপ্লবী নেতাকে, তার বিপ্লবী চরিত্রকে সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে তার ব্যক্তিগত অভ্যাসগুলিকে আমরা নকল কোরে চোলেছি। সশস্ত্র সংগ্রাম ছেড়ে নফসের সঙ্গে সংগ্রামের আশ্রয় গ্রহণ করার ও তার প্রিয় নবীর অমন চরম অবমূল্যায়ণের জন্য আল্লাহ(Allah) এই জাতিকে চরম শাস্তি দিতেও ছাড়ননি। ঐ দুইটি কাজ করার পর তিনি ঐ জাতির শত্রুরা, যারা এই উম্মাহর নাম শুনলেও ভয়ে কাঁপতো, সেই শত্রুর মন থেকে এদের সম্বন্ধে ভয় তুলে নিলেন, এবং সে ভয় এই জাতির হৃদয়ে ঢুকিয়ে দিলেন। তারপর প্রায় সমস্ত জাতিটাকেই শত্রুর ক্রীতদাসে পরিণত কোরে দিলেন। এই শাস্তি শুধু যে এই দুনিয়াতেই নয়, আখেরাতেও, তাও বোলে দিলেন।

২৭। উম্মতে মোহাম্মদীর উদ্দেশ্যের উপমা

উৎস: Islam and Dajjal
এই পর্য্যন্ত যা বোলে এলাম তাতে এই উম্মাহর বর্তমান দুঃখজনক ও করুণ অবস্থা ও তার প্রকৃত কারণ পরিষ্কার কোরে বোঝাতে পেরেছি কি না জানি না। তবে আমার অক্ষমতা সত্বেও যারা অকপট হৃদয়ে বুঝতে চান তারা ইনশাল্লাহ বুঝবেন। অনেক সময় কোন ব্যাপারে উপমা দিয়ে বুঝালে সহজ হয়। তাই কোরান, বাইবেল ইত্যাদিতেও আল্লাহ(Allah) অনেক ব্যাপারে উপমার সাহায্যে মানুষকে বুঝিয়েছেন। আমি এখানে একটা উপমা পেশ কোরছি।

মনে করুন আপনি একটি বিশাল দেশের বাদশাহ এবং আপনি সর্বজ্ঞানী, সর্বশক্তিমান (আল্লাহ)। অপর একটি বিরাট দেশের একজন বাদশাহ (ইবলিস) আপনাকে চ্যালেঞ্জ দিলেন যে তিনি আপনার দেশের প্রজাদের (মানব জাতি) আপনার অবাধ্য কোরে দেশে বিশৃংখলা, মারামারি, যুদ্ধ, রক্তপাত বাঁধাবেন, আপনার দেশের আইন-শৃংখলা নষ্ট কোরে দেবেন। আপনি দেখতে চাইলেন যে আপনার দেশের প্রজারা আপনাকেই প্রভু বোলে স্বীকার ও গ্রহণ করে, নাকি ঐ অন্য দেশের বাদশাহর প্ররোচনায় আপনাকে অস্বীকার করে। আপনার বিরাট দেশটি অনেক প্রদেশে বিভক্ত, অনেক ভাষা, অনেক রংয়ের মানুষ। এমন একটি সময় এলো যখন দেখা গেলো যে ঐ অন্য বাদশাহর (ইবলিসের) প্ররোচনায় পড়ে আপনার দেশের মানুষ নিজেদের এক জাতি বোলে বিশ্বাস করা ছেড়ে দিলো, বিভিন্ন প্রদেশের মানুষ নিজেদের সম্পূর্ণ আলাদা আলাদা জাতি বোলে ঘোষণা করলো, ভৌগোলিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা(Nation State)। শুধু তাই নয়, তারা আপনার দেয়া আইন-কানুন, দণ্ডবিধি প্রত্যাখ্যান কোরে প্রত্যেক প্রদেশ স্বাধীনতা ঘোষণা করলো, নিজেরা নিজেদের ইচ্ছামত সংবিধান (Constitution) তৈরী কোরে নিলো; আইন-কানুন, দণ্ডবিধি ইত্যাদি তৈরী কোরে সেই মোতাবেক চলতে লাগলো। যেহেতু আপনার প্রজাদের জ্ঞান-বুদ্ধি সীমিত, কাজেই তাদের তৈরী সংবিধান ও আইন-কানুন, দণ্ডবিধি ইত্যাদির অবশ্যম্ভাবী ফল হলো, রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক অবিচার ও অন্যায়। তার চেয়েও বড় পরিণাম হলো ঐ বিভিন্ন প্রদেশগুলি নিজেদের মধ্যে স্বার্থ নিয়ে যুদ্ধ বাঁধিয়ে ত্রুমাগত হত্যা ও রক্তপাত ‘সাফাকু দ্দিমা’ চালাতে লাগলো।

আপনার রাজত্বে যখন এই অবস্থা হলো তখন আপনি আপনার সমস্ত সাম্রাজ্য খুঁজে আপনার প্রজাদের মধ্যে সবচেয়ে চরিত্রবান, সব চেয়ে নির্ভীক, সবচেয়ে কর্মঠ, সবচেয়ে কর্তব্যপরায়ন, এক কথায় সর্বগুণান্বিত মানুষটিকে (মোহাম্মদ দঃ) ডেকে এনে তাকে আপনার সাম্রাজ্যের পরিস্থিতি বুঝিয়ে দিলেন। তারপর তার হাতে আপনার অসীম জ্ঞান থেকে রচিত এমন একটি সংবিধান (কোরান) দিয়ে তাকে বোললেন- আমি তোমাকে আমার সেনাপতি নিযুক্ত কোরলাম। এখন থেকে তোমাকে দায়িত্ব দিলাম সাম্রাজ্যের প্রদেশগুলি যে নিজেদের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা কোরেছে সেগুলি নস্যাৎ কোরে আমার সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করার এবং এই সংবিধান কার্যকরী করার (কোরান- সূরা আত-তওবা, আল-ফাতাহ-২৮, সূরা আস-সফ- ৯)। আপনার এই নতুন সেনাপতিকে আরও বোললেন- একটি নিখুঁত সংবিধান রচনা করাই যথেষ্ট নয়, সেটা যদি পূর্ণভাবে কার্যকরী না করা হয়, তবে তা ব্যর্থ- অর্থহীন। কাজেই একে পূর্ণভাবে অর্থাৎ জাতীয় ও ব্যক্তিগত উভয়ভাবে কার্যকরী কোরতে হবে (কোরান- সূরা আল-বাকারা ২০৮)। তবে আমি আমার অসীম জ্ঞানে জানি যে আমার প্রজারা আমার শত্রু বাদশাহর (ইবলিসের) প্ররোচনায় এতখানি অভিভূত হোয়ে আছে যে তারা সহজে তোমার কথা শুনবে না। তারা তোমাকে বাধা দেবে, তোমাকে হত্যা করার চেষ্টা কোরবে, তোমার বিরুদ্ধে যুদ্ধ বাঁধাবে। কাজেই তুমি প্রথমে একটি জাতি গঠন কর এবং জাতিটিকে এই সংবিধান অনুযায়ী পরিচালনা কর। এই সংবিধানেই আমি এমন ব্যবস্থা রেখেছি যে এই সংবিধান অনুযায়ী চললে তারা অজেয়, দুর্দ্ধর্ষ যোদ্ধায় পরিণত হবে, কারণ এই সংবিধানেই আমি তাদের শিক্ষার, ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা রেখেছি (নামায)। তার ওপর যোদ্ধাদের জন্য রেখেছি এমন পুরষ্কার যে, তারা তা কল্পনাও কোরতে পারে না। আমার সার্বভৌমত্ব ও এই সংবিধান প্রতিষ্ঠার যুদ্ধে যারা প্রাণ দেবে তাদের সমস্ত রকম ভুল-ত্রুটি, অপরাধ ক্ষমা করা ছাড়াও তাদের মৃত বলা পর্য্যন্তও আমি নিষিদ্ধ কোরে দিয়েছি (কোরান- সূরা আল-বাকারা- ১৪৫, সূরা আলে ইমরান- ১৬৯)। যাই হোক এরপরও তুমি তাদের নিজে প্রশিক্ষণ দাও এবং যুদ্ধে নেতৃত্ব দাও। প্রথমে তুমি আমার সাম্রাজ্যের বিপথগামী মানুষদের ডাকো, তাদের বলো- সাম্রাজ্য আমার, সার্বভৌমত্ব আমার, এর সংবিধান রচনা কোরেছি আমি। তারা যদি মেনে নেয়, ভালো। যদি না মানে তবে তাদের বলো তাদের রাষ্ট্রশক্তি তোমাদের হাতে ছেড়ে দিতে। তোমরা সেখানে জাতীয় জীবনে আমার সর্বভৌমত্ব ও সংবিধান প্রতিষ্ঠা কর। তাতেও যদি আমার বিদ্রোহী প্রজারা রাজী না হয়, তবে তাদের আক্রমন কোরে পরাজিত কোরে আবার আমার সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা কর। আমার সাম্রাজ্যে (পৃথিবীতে) আমার সার্বভৌমত্ব ও সংবিধান প্রতিষ্ঠার জন্যই তোমাকে সেনাপতি নিযুক্ত কোরলাম (কোরান- সূরা আল- ফাতহ ২৮)।

সেনাপতি পদে নিযুক্ত হোয়ে আপনার সেনাপতি তীব্র বাধার মুখে, নির্মম অত্যাচারের মুখে বিরামহীন প্রচেষ্টা, অকল্পনীয় ত্যাগ, ও অপূর্ব চরিত্র বলে একটি সামরিক জাতি গড়ে তুললেন। সেনাপতির অতুলনীয় চরিত্রের ও প্রশিক্ষণের প্রভাবে এই জাতির প্রতিটি লোক যে শুধু দুর্দ্ধর্ষ যোদ্ধাই হলো তাই নয়, তারা আপনার সার্বভৌমত্ব ও সংবিধান আপনার সাম্রাজ্যে প্রতিষ্ঠায় দুর্জয় পণে আত্মোৎসর্গকারী হোয়ে গেলো। ব্যক্তিগত চরিত্রের পবিত্রতায়, তাকওয়ায় ইত্যাদি গুণে এই বাহিনীর প্রতিটি মানুষ বিস্ময়কর উন্নতি কোরলেও তাদের সর্বপ্রধান বৈশিষ্ট্য এই হোয়ে দাঁড়াল যে, তাদের প্রত্যেকটি মানুষ দুর্দ্ধর্ষ যোদ্ধায় রূপান্তরিত হোয়ে গেলো। এরপর আপনার সেনাপতি আপনার আদেশে আপনার অবাধ্য প্রজাদের মুখোমুখি হোয়ে তাদের যা বোললেন তার মোটামুটি মর্মার্থ হোচ্ছে এই যে- হে আমার মহামহিম সম্রাটের প্রজাবৃন্দ! তোমরা তোমাদের সম্রাটের শত্রুর (ইবলিসের) প্ররোচনায় তার বিদ্রোহী হোয়েছ, তার সার্বভৌমত্ব অস্বীকার কোরে নিজেরা সার্বভৌম হোয়েছ, সম্রাটের সাম্রাজ্যের প্রদেশগুলিকে এক একটি স্বাধীন রাজ্যে (ভৌগলিক রাষ্ট্রে) পরিণত কোরে নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ ও রক্তপাত করছো, সম্রাটের দেওয়া আইন-কানুন দণ্ডবিধি সব পরিত্যাগ কোরে নিজেরা আইন-কানুন তৈরী কোরে নিজেদের রাজ্যগুলি শাসন করছো, যার ফল হোয়েছে রাজ্যগুলির ভেতর রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক অত্যাচার, অবিচার ও সাম্রাজ্যের প্রদেশগুলির মধ্যে সংঘর্ষ, যুদ্ধ আর রক্তপাত। মহা দয়ালু সম্রাট যথেষ্ট দেখেছেন, যথেষ্ট সহ্য করেছেন, আর নয়। মহামহিম সম্রাট আমাকে আর আমার এই বাহিনীকে পাঠিয়েছেন তোমাদের এই বার্তা দিতে যে তোমরা অন্য সব রকম সার্বভৌমত্ব ত্যাগ কোরে আবার একমাত্র সম্রাটের সার্বভৌমত্বকে (তওহীদ) স্বীকার কর, তার কাছে প্রত্যাবর্তন কর, তার কাছে আত্মসমর্পণ কর এবং তিনি যে নতুন সংবিধান তার অসীম জ্ঞান থেকে প্রণয়ন কোরেছেন (কোরান) এবং এই যে আমার সঙ্গে পাঠিয়েছেন তা গ্রহণ কর, এবং এই সংবিধান অনুযায়ী তোমাদের রাজনৈতিক, আর্থ-সামাজিক জীবন পরিচালিত করো, এর মধ্যেই যে আইন-কানুন আছে সেই অনুযায়ী অপরাধের শাস্তি ও পুরষ্কার দাও। আমাদের সম্রাট তোমাদের আরও বোলতে বোলেছেন যে তোমাদের মধ্যে যারা এখন আবার তাকে সার্বভৌম প্রভু বোলে স্বীকার কোরে তার দেয়া সংবিধানকে গ্রহণ করবে তাদের পেছনের সব অপরাধ তিনি ক্ষমা কোরে দিয়ে তাদের বিরাট পুরষ্কার দেবেন। এমন কি এরপরেও তাদের ব্যক্তিগত জীবনের অপরাধ, পাপ, তা সে যত বড় অপরাধই হোক, অকপটচিত্তে তার কাছে মাফ চাইলে তা মাফ কোরে দেবেন। কিন্তু তার সার্বভৌমত্বকে স্বীকার না করলে, তাকে একমাত্র সম্রাট বোলে স্বীকার না কোরলে, ব্যক্তি জীবনে যে যতই ভালো কাজ করুক সম্রাট তা গ্রহণ কোরবেন না, এবং তাকে ভয়াবহ শাস্তি দেবেন।

আপনার সেনাপতির এই ঘোষণায় এই ফল হলো যে আপনার সার্বভৌমত্ব অস্বীকারকারী আপনার প্রদেশের রাজ্যগুলি আপনার সেনাপতির আহ্বান প্রত্যাখ্যান কোরে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হোয়ে দাঁড়ালো। তখন আপনার আদেশে আপনার সেনাপতি শত্রুর তুলনায় অনেক ছোট তার বাহিনী নিয়ে অনেক বড় শত্রুকে আত্রুমণ কোরলেন। আপনার সেনাপতি তার ঐ ছোট বাহিনীকে এমন প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন, সম্রাটের জন্য তাদের প্রাণ উৎসর্গ করার এমন প্রেরণা সৃষ্টি কোরছিলেন যে ঐ ছোট্ট বাহিনী আপনার বিদ্রোহী ঐ সব প্রদেশের শক্তিশালী সুশিক্ষিত ও কয়েক গুণ বড় সামরিক বাহিনীগুলিকে একের পর এক যুদ্ধে শোচনীয়ভাবে পরাস্ত কোরে আপনার সাম্রাজ্যে আবার আপনার সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা ও আপনার সংবিধান কার্যকরী কোরতে লাগলো। আপনি যখন আপনার সেনাপতিকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন তখন আপনার সাম্রাজ্যের সমস্ত প্রজারাই আপনার সার্বভৌমত্ব অস্বীকার কোরে যার যার প্রদেশে তাদের নিজেদের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা কোরেছিলো, কোথাও আপনার সংবিধান চালু ছিলো না। আপনার সেনাপতি তার তৈরী ঐ দুর্দ্ধর্ষ বাহিনী নিয়ে সাম্রাজ্যের একটি ছোট অংশে (আরবে) আপনার সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা ও সংবিধান চালু করার পর আপনার প্রিয় সেনাপতির আয়ু শেষ হোয়ে গেলো। চলে যাবার আগে তিনি তার বাহিনীকে পরিষ্কার কোরে বুঝিয়ে দিয়ে গেলেন যে তিনি ঐ বাহিনী কেন সৃষ্টি কোরেছিলেন। বুঝিয়ে দিয়ে গেলেন যে ঐ বাহিনী সৃষ্টি করা, তাদের নিয়ম-শৃংখলা, আনুগত্যের ঐক্যের ও যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দেয়া, তাদের যুদ্ধের নেতৃত্ব দেয়া ইত্যাদি সব কিছুর মূল উদ্দেশ্য হলো বিদ্রোহী সাম্রাজ্যময় (সমস্ত পৃথিবী) আবার আপনার সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা। সেনাপতি তার বাহিনীকে বোললেন- আমার প্রভু, সম্রাট আমাকে আদেশ দিয়েছেন নিরবিচ্ছিন্ন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে যে পর্য্যন্ত না তার সাম্রাজ্যের প্রতিটি প্রজা একমাত্র তাকেই রাজাধিরাজ বোলে স্বীকার করে এবং আমাকে তার প্রেরিত সেনাপতি বোলে মেনে নেয় [হাদীস- আব্দুল্লাহ বিন ওমর (রাঃ) থেকে বোখারী]। আমার ওপর দেয়া দায়িত্ব আমি পূর্ণ কোরে যেতে পারলাম না, কারণ তা এক জীবনে সম্ভব নয়। এ দায়িত্ব আমি ছেড়ে যাচ্ছি তোমাদের ওপর। মনে রেখো আমার ওপর দেয়া আমার সম্রাটের এ দায়িত্ব যে ছেড়ে দেবে বা বন্ধ কোরবে সে আমার কেউ নয়, তাকে আমি অস্বীকার করবো, সে আমার বাহিনীর পলাতক সৈন্য (Deserter)। তাদের কোন সৎ কাজ আমার প্রভু মহামহিম সম্রাট গ্রহণ করবেন না।

আপনার সেনাপতি তার অতুলনীয় চরিত্রের প্রভাবে, অক্লান্ত পরিশ্রমে, কঠোর সাধনায় তার সৈন্য বাহিনীকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এমন দুর্জয় যোদ্ধায় পরিণত কোরেছিলেন, তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে (আকীদা) এমন পরিষ্কারভাবে তাদের মনমগজে স্থাপন কোরেছিলেন, বাহিনীর মধ্যে এমন ইস্পাত কঠিন ঐক্য ও শৃংখলা গড়ে দিয়েছিলেন যে, ঐ বাহিনী সর্বদিক দিয়ে বিদ্রোহীদের চেয়ে দুর্বল হোলেও প্রতিটি সংঘর্ষে, প্রতিটি যুদ্ধে আপনার সেনাপতির বাহিনী বিজয়ী হোতে লাগলো এবং আপনার সার্বভৌমত্ব ও সংবিধান প্রতিষ্ঠা কোরতে লাগলো। এই বাহিনী ৬০/৭০ বছরের মধ্যে নিরবিচ্ছিন্ন সংগ্রাম ও যুদ্ধ কোরে আপনার সাম্রাজ্যের প্রায় অর্দ্ধেক পরিমাণ আবার আপনার সার্বভৌমত্বের অধীনে নিয়ে এনে তাতে আপনার তৈরী নিখুঁত সংবিধান চালু কোরে আপনার প্রজাদের মধ্যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সামাজিক সুবিচার ও পূর্ণ নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করলো। অন্য যে বাদশাহ (ইবলিস) আপনাকে চ্যালেঞ্জ দিয়েছিলো আপনার রাজ্যে অশান্তি আর রক্তপাত চালু রাখবে, সে ব্যর্থ হোয়ে গেলো।

কিন্তু আপনি দেখলেন যে আপনার সাম্রাজ্যের অর্দ্ধেক পরিমাণে আপনার সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা ও আপনার তৈরী সংবিধান কার্যকরী করার পর আপনার সেনাপতির তৈরী বাহিনী হঠাৎ তাদের উদ্দেশ্য ভুলে গেলো। বিজিত অর্দ্ধেক সাম্রাজ্যের ধন-দৌলত, শান-শওকত, শক্তি ও ক্ষমতা হাতে পেয়ে তারা তাদের আসল উদ্দেশ্য ভুলে মহাসমারোহে রাজত্ব কোরতে লাগল। অবশ্য তারা তাদের বিজিত এলাকায় তাদের ওপর আপনার দেয়া দায়িত্ব পালন করলো, অর্থাৎ সেখানে আপনার সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা ও আপনার দেয়া সংবিধান চালু করলো। কিন্তু সাম্রাজ্যের বাকি অংশকেও যে আপনার সার্বভৌমত্বের অধীনে এনে সেখানেও সংবিধান চালু করার দায়িত্ব ছিলো সেটা তারা ত্যাগ করলো। এতদিন আপনার সেনাপতির বাহিনীর সামনে একটিমাত্র উদ্দেশ্য ছিলো, সেটা হলো আপনার সমস্ত রাজ্যে একমাত্র আপনার সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা ও আপনার সংবিধান চালু করা এবং সেই প্রচেষ্ঠায়, সেই সংগ্রামে জীবন উৎসর্গ কোরে আপনার সন্তুষ্টি অর্জন করা ও আপনার প্রতিশ্রুত অভাবিত পুরষ্কার অর্জন করা। ঐ সংগ্রামে তারা দিনরাত এত ব্যস্ত থাকতো, এমন একাগ্র লক্ষ্যে (হানিফ) তারা সংগ্রাম করতো যে তাদের অন্য কোন কিছুতেই মন দেবার সময় থাকতো না। এইবার সংগ্রাম ত্যাগ করার পর তারা হাতে সময় পেলো। এই সময় তারা কেমন কোরে ব্যয় কোরবে? উপায়ও তারা বের কোরে ফেললো। যে সংবিধান চালু করার দায়িত্ব আপনি ও আপনার সেনাপতি ঐ বাহিনীকে দিয়েছিলেন- সেই সংবিধানের আইন, নিয়ম-কানুন, আদেশ-নিষেধগুলিকে তারা ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ কোরতে আরম্ভ করলো; ঠিক যে কাজটা আপনি ও আপনার সেনাপতি বার বার নিষেধ কোরেছিলেন, কারণ আপানারা জানতেন যে ঐ বিশ্লেষণের অবশ্যাম্ভাবী পরিণতি হোচ্ছে মতভেদ, বাহিনীর ঐক্য ধ্বংস ও বিদ্রোহীদের হাতে পরাজয়। পরিণাম এত ভয়াবহ বোলেই আপনার সংবিধানেই আপনি ঐ কাজ করাকে নিষিদ্ধ কোরে দিয়েছিলেন (কোরান- সূরা আলে-ইমরান- ১০৫)। আপনার সেনাপতিও এর গুরুত্ব উপলব্ধি কোরে সংবিধানের কোন ধারা-উপধারার অর্থ নিয়ে মতভেদ ও তর্ক করাকে, স্বয়ং সম্রাটকে অস্বীকার (কুফর) করার সমান অপরাধ বোলে তার বাহিনীর মধ্যে ঘোষণা কোরে দিয়েছিলেন। কিন্তু সংগ্রাম ত্যাগ করার পর যে সময় পাওয়া গেলো তখন আর কারও ঐ সব আদেশ ও সাবধানবাণী মনে রোইল না। আপনার সেনাপতি তার অপরিসীম অধ্যবসায়ে তার সৈন্য বাহিনীর মধ্যে যে প্রচণ্ড বর্হিমুর্খী কার্যক্ষমতা সৃষ্টি কোরেছিলেন, তা ব্যয় হোতে লাগলো সংবিধানের ধারা-উপধারার ব্যাখ্যায়, সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিশ্লেষণে ও ঐগুলি প্রচারে। অতি শীঘ্রই ঐ বাহিনী ঐ ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের ওপর নানা দলে-উপদলে (মাযহাবে, ফেরকায়) বিভক্ত হোয়ে গেলো, বাহিনীর ঐক্য ভেঙ্গে চুরমার হোয়ে গেলো।শুধু তাই নয়-যে বাহিনীকে আপনার সেনাপতি গঠন কোরেছিলেন আপনার বিদ্রোহী প্রজাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কোরে তাদের আবার আপনার শাসনে ফিরিয়ে আনতে, তারা বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের বদলে নিজেদের দল-উপদলের মধ্যেই যুদ্ধ ও রক্তপাত শুরু কোরে দিলো। যে সংবিধান প্রতিষ্ঠার জন্য ঐ বাহিনী সৃষ্টি করা হোয়েছিলো, সে সংবিধানকে প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ বাদ দিয়ে ঐ সংবিধানেরই আইন-কানুনের অর্থ নিয়ে ঐ বাহিনী ঐক্য নষ্ট কোরে নিজেদের মধ্যে রক্তপাত শুরু কোরে দিলো। আপনার ও আপনার সেনাপতির আসল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হোয়ে গেলো।

উদ্দেশ্যের ব্যর্থতার এইখানেই শেষ নয়। আপনার সেনাপতির বাহিনী যখন সংবিধানের চুলচেরা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও তাই নিয়ে নিজেদের মধ্যে মারামারিতে ব্যস্ত, শাসক ও নেতারা যখন মহাশান-শওকতের সঙ্গে বাদশাহীতে ব্যস্ত, তখন আপনার ঐ বাহিনীর মধ্য থেকে আরেক দল লোক গজালো- যারা এই প্রচার কোরতে আরম্ভ করলো যে আপনার সাম্রজ্যে আপনার বিদ্রোহী প্রজাদের দমন কোরে আপনার সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম-টংগ্রাম ওসব কিছু নয়, ব্যক্তিগতভাবে নিজের আত্মার ধোয়া-মোছা, ঘষা-মাজা কোরে আত্মার উন্নতি কোরে নানা রকম কেরামতের শক্তি অর্জন করাই হচ্ছে প্রকৃত কাজ। এর নাম তারা দিলো আপনার (আল্লাহর) নৈকট্য লাভ। কেমন কোরে ধোয়া-মোছা, ঘষা-মাজা কোরলে আত্মার শক্তি বৃদ্ধি পাবে, কেরামতের শক্তি জন্মাবে, সে জন্য তারা নানা রকম প্রক্রিয়া (তরীকা) উদ্ভাবন কোরে ফেললো। বাহিনীর বহু লোক ঐ মতবাদ বিশ্বাস কোরে তাদের অনুসারী হোয়ে গেলো। তারা এ কথা বুঝতে ব্যর্থ হলো যে আপনি ও আপনার সেনাপতি যে উদ্দেশ্যে এই বাহিনী গঠন কোরেছিলেন তাদের ঐ মতবাদ তার ঠিক বিপরীত। অর্থাৎ আপনার বাহিনীকে সৃষ্টি করা হোয়েছিলো বহির্মুখী সংগ্রামের জন্য, আর ঐ মতবাদ হোচ্ছে সংগ্রাম ত্যাগ কোরে অন্তর্মুখী হোয়ে শুধু আত্মার ধোয়া-মোছার জন্য। আপনার সাম্রাজ্যে আপনার সার্বভৌমত্ব অস্বীকারকারী বিদ্রোহীদের দমন কোরে তাদের আবার আপনার সার্বভৌমত্বে ফিরিয়ে এনে আপনার সংবিধান চালু করার সংগ্রাম ত্যাগ কোরে অন্য কোনভাবেই যে আপনার সন্তুষ্টি অর্জন করা অসম্ভব তাও তারা বুঝতে অক্ষম হলো। কোন কর্মকর্তার অধীনস্থ কর্মচারীরা তাদের কর্তব্য কাজ বাদ দিয়ে সারাদিন যদি কর্মকর্তার পায়ে সাজদায় পড়ে থাকে বা তার পদসেবা কোরতে থাকে তবে সেই কর্মকর্তা কখনও খুশী হোতে পারেন কি? কখনই নয়। বিশেষ কোরে যদি সে কর্মকর্তা পৃথিবীর কোন কিছুর মুখাপেক্ষী না হন, বে-নেয়ায হন। কিন্তু করুণ ব্যাপার হলো এই যে, সংগ্রাম ত্যাগী আপনার সৈন্য দলের ঐক্য ধ্বংসকারী বিশ্লেষক দল ও আপনার সন্তুষ্টিকাংখী আত্মা ঘষা-মাজার দল এই উভয় দলই নিজেদের অতি উৎকৃষ্ট সৈনিক মনে কোরে মহা উৎসাহে দৈনিক পাঁচবার কুচ-কাওয়াজ, আপনাকে অভিবাদন ও সংবিধানের অন্যান্য ছোটখাট সব কাজ কর্ম দক্ষতার সাথে পালন কোরে যেতে লাগলো। এই হাস্যকর পরিস্থিতির প্রকৃত কারণ হলো আপনার সেনাপতির সৈন্য বাহিনী ও সেনাপতির আকীদার বিকৃতি, অর্থাৎ যে উদ্দেশ্য আপনি ও আপনার সেনাপতি বাহিনীর সম্মুখে স্থাপন কোরেছিলেন, তা পরিবর্তন কোরে বিভিন্ন উদ্দেশ্য স্থাপন ও তার ফলে সংগ্রাম ত্যাগ করা।

আকীদার বিকৃতির ফলে উদ্দেশ্য ব্যর্থ হোয়ে যাবার পর আপনার ঐ সৈন্যবাহিনীর আর কোন অর্থ রইল না। কিন্তু আকীদার বিকৃতির কারণেই অর্থহীন হোয়ে গেলেও ঐ বাহিনী অতি নিষ্ঠার সাথে সংবিধানের আইন-কানুন, কুচ-কাওয়াজ, ইউনিফরম, হেলমেট, বুট ইত্যাদি পরা ছাড়াও ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র নিয়ম-কানুনও নিখুঁতভাবে পালন কোরে যেতে লাগলো। এইভাবে কিছুদিন চলার পর সংগ্রামহীন, যুদ্ধহীন অবস্থায় থাকার ফলে, আপনার বাহিনী আস্তে আস্তে যুদ্ধই ভুলে যেতে লাগলো এবং ক্রমে এমন একটা সময় এলো যখন আপনি দেখলেন যে আপনার সৈন্যরা যোদ্ধার বদলে অতি নিপুন আইনজ্ঞ ও অতি উৎকৃষ্ট সাধু-সন্তে রূপান্তরিত হোয়ে গেছে। আপনার সেনাপতি সারা জীবনের সাধনায় যে দুর্দ্ধর্ষ যোদ্ধা সৃষ্টি কোরেছিলেন তারা আর এখন যুদ্ধের কথাই বলে না। তাদের একদল সংবিধানের আইন-কানুনের দণ্ড-বিধির ধারা-উপধারার অর্থ নিয়ে নিজেরা মারামারি করে, আরেক দল সর্ব রকম বিপদাপদ থেকে অতিসন্তর্পণে নিজেদের বাঁচিয়ে ঘরের কোণে বোসে আপনাকে স্মরণ (যিকর) করে।

আপনার সাম্রাজ্যের বাকি অর্দ্ধেকের বিদ্রোহীরা কিন্তু বোসে ছিলো না। তারা সচেষ্ট ছিলো কেমন কোরে আবার আপনার সংবিধানকে (কোরান) বাদ দিয়ে নিজেদের তৈরী সংবিধান চালু করবে।

আপনার বাহিনীর যখন ঐ অবস্থা তখন আপনার সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রদেশের বিদ্রোহীরা তাদের বিভিন্ন সৈন্যবাহিনী নিয়ে আপনার সাম্রাজ্যের যে অর্দ্ধেকটাতে আপনার সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হোয়েছিলো তা আত্রুমণ করতে এসে আপনার বাহিনীর মুখোমুখি এসে দাঁড়াল।

বিদ্রোহী বাহিনী ও তার সেনাপতিরা লক্ষ্য কোরে দেখলো আপনার বাহিনীর সৈন্য-সেনাপতিরা যুদ্ধ ভুলে গেছে। আপনার সৈন্য বাহিনীর উদ্দেশ্য ও কর্তব্য নির্ধারণ কোরে এবং সেই উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য, প্রশিক্ষণের জন্য আপনি যে সংবিধান আপনার বিগত সেনাপতির মাধ্যমে তাদের জন্য দিয়েছিলেন, সেই সংবিধানের আদেশ-নিষেধ, নিয়ম-কানুন ইত্যাদির অর্থ ও ব্যাখ্যা নিয়ে মতভেদ হোয়ে আপনার বাহিনীর সেনাপতি ও সৈন্যরা বহু ভাগে বিভক্ত, ঐ অর্থ ও ব্যাখ্যা নিয়ে নিজেদের মধ্যে মারামারি, রক্তপাত কোরছে। কতকগুলি সেনাপতি ও সৈন্য ঐ সব গোলমালে না যেয়ে সেনানিবাসে তাদের যার যার কামরায় বোসে বোসে সর্বক্ষণ আপনাকে মনে কোরছে (যিকির) ও নানা রকম ক্রিয়া-কর্মের মাধ্যমে তাদের আত্মার উৎকর্ষের জন্য কঠিন পরিশ্রম কোরছে। বিদ্রোহী সৈন্য-সেনাপতিরা আরও লক্ষ্য করলো যে আপনার বাহিনীর সৈন্য সেনাপতিরা যুদ্ধ ভুলে গেলেও সংবিধানে আপনি যুদ্ধের প্রশিক্ষণের জন্য যে দিনে পাঁচবার কুচকওয়াজের (নামায) ব্যবস্থা রেখেছিলেন তা অতি নিষ্ঠার সাথে পালন করে। শুধু এ পাঁচবার নয় বহু সৈন্য গভীর রাত্রে ঘুম থেকে উঠে উর্দী পড়ে একা একা কুচকাওয়াজ করে আপনাকে সন্তুষ্ট করার জন্য (তাহাজ্জুদ)। এ ছাড়াও ঐ সংবিধান মোতাবেক উর্দী, বুট ও বোতামের পালিশ, নিয়ম মাফিক চুল, দাড়ি, মোচ ইত্যাদি তুচ্ছতম ব্যাপারেও আপনার সৈন্য দল অতি দক্ষ, অতি নিখুঁত। কিন্তু যে কারণে ঐ কুচকাওয়াজ ঐ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা আপনি এ সংবিধানে রেখেছিলেন তা ভুলে যাওয়ায় তারা যুদ্ধই ভুলে গেছে। যুদ্ধের প্রশিক্ষণকেই তারা উদ্দেশ্য মনে কোরে নিয়েছে। এরপর যখন বিদ্রোহী সেনাবাহিনী আপনার বাহিনীকে আত্রুমণ করলো, তখন আপনি দেখলেন যে স্থানে স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু সৈন্য বিদ্রোহীদের বাধা দিলেও আপনার বাহিনীর সৈন্য-সেনাপতিরা বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে যুদ্ধ করলো না, তারা অতি নিষ্ঠার সাথে নিখুঁতভবে কুচকাওয়াজ কোরতে লাগলো, অতি দক্ষতার সাথে বন্দুক, কামান, মর্টার মারা শিখতে থাকলো। সংবিধানের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে তারা এতভাবে এত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়ে বিভক্ত যে ঐক্যবদ্ধভাবে কোন সেনাপতির অধীনে যুদ্ধ করাও তাদের পক্ষে অসম্ভব ছিলো। বিচ্ছিন্নভাবে যে সামান্য প্রতিরোধ করা হলো তাও প্রতি ক্ষেত্রে আপনার সৈন্য বাহিনী বিদ্রোহীদের কাছে পরাজিত হোয়ে গেলো, কারণ তারা আর আপনার বিগত সেনাপতির শিক্ষায় শিক্ষিত নেই, অজেয় যোদ্ধা নেই।

এই অবস্থায় আপনি আপনার সৈন্য-সেনাপতিদের কাছে দৌঁড়ে লোক পাঠালেন। তারা যেয়ে সৈন্য-সেনাপতিদের বললো-হায়। কী সর্বনাশ! সম্রাটের বিদ্রোহীরা আত্রুমণ কোরেছে তার রাজ্য দখল করার জন্য, আর তোমরা প্যারেড, কুচকাওয়াজ কোরে যাচ্ছ? যে কারণে তোমাদের এত কুচকাওয়াজ- সেই উদ্দেশ্যই ভুলে গেছো? তোমাদের বিগত সেনাপতি কি বোলে যাননি যে তোমাদের এই কুচকাওয়াজের (নামাযের) আসল উদ্দেশ্য যুদ্ধ (জেহাদ) [হাদীস- মুয়ায (রাঃ) থেকে- আহমদ, তিরমিযি, ইবনে মাজাহ]। এখন কুচকাওয়াজ ছেড়ে সম্রাটের বিদ্রোহীদের বাধা দাও, যুদ্ধ কর। এ কথা শুনে আপনার সৈন্য-সেনাপতিরা বললো- শোন আহাম্মক! এই দ্যাখো আমাদের প্রভু মহামহিম সম্রাটের দেয়া বই, সংবিধান। এতে যা যা করার আদেশ আছে তা আমরা অক্ষরে অক্ষরে পালন কোরে যাচ্ছি। এইগুলি পালন কোরে সম্রাটকে খুশী করাই, তার সান্নিধ্য লাভ করাই আমাদের জীবনের লক্ষ্য। দেখোনা দিনে পাঁচবার কুচকাওয়াজ করার হুকুম এই বইয়ে আশীবারের চেয়েও বেশী করা আছে। তোমার কথায় আমরা আশীবারের আদেশ অমান্য কোরে যুদ্ধ কোরতে যাব? আপনার লোক তাদের বোঝাতে চেষ্টা করলো দিনে পাঁচবার কুচকাওয়াজ ও ড্রিল করার কথা আশীবার যেমন আছে তেমনি সংবিধানের ছয় হাজারের বেশী আয়াতের মধ্যে দু'শ ষোলটিরও বেশী আয়াত যুদ্ধের ব্যাপারে আছে। কিন্তু আপনার সৈন্য-সামন্ত ও তাদের সেনাপতিদের আকীদা এত বিকৃত হোয়ে গিয়েছিলো এবং বহুদিন ঐ আকীদায় থাকার ফলে যুদ্ধ এমনভাবে ভুলে গিয়েছিলো যে তারা আপনার পাঠানো লোকের কথায় কোন কান দিলো না।

আপনার সৈন্য সামন্ত অতি দক্ষতার সাথে কুচকাওয়াজ ও প্রশিক্ষণ নিতে থাকলো, অতি নিষ্ঠার সাথে সংবিধানের অন্যান্য খুঁটিনাটি নিয়ম পালন কোরতে থাকলো, বিদ্রোহীরা এসে আপনার সেনাপতি ও তার দুর্দ্ধর্ষ বাহিনী আপনার সাম্রাজ্যের যে অর্দ্ধেক অংশে আপনার সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা কোরেছিলেন তা পুনরায় অধিকার কোরে তাদের নিজস্ব সার্বভৌমত্ব ও সংবিধান প্রতিষ্ঠা করলো। তারপর তারা বিদ্রুপের মুচকি হেসে আপনার কুচকাওয়াজরত বাহিনীকে বললো- বাবারা! তোমরা খুব কর্ত্তব্যনিষ্ঠ! এমনিভাবেই তোমরা তোমাদের সম্রাটের সেবা কোরে যাও। তিনি তোমাদের যে বই দিয়েছেন তাতে যা সব লেখা আছে তা চুলচেরা বিশ্লেষণ কোরতে থাক, সেই সব বিশ্লেষণগুলি সভা-সমিতি কোরে, বই লিখে প্রচার কোরতে থাক, কোন আদেশ-নিষেধের গভীরে কী গুপ্ত অর্থ আছে তা নিয়ে গবেষণা ও বাহাস কোরতে থাক। তাতে যদি তোমাদের মধ্যে কিছু মতভেদ হয়, মারামারি হয় তাতে কুছ পরওয়া নেই, ওটুকু সত্য প্রকাশে হোয়েই থাকে। এই কাজগুলি করলে তোমাদের সম্রাট তোমাদের ওপর খুব খুশী থাকবেন। কিন্তু খবরদার! আমাদের এই সরকার-এর নীতি, রাজনীতি, অর্থনীতি, দণ্ডবিধি, শিক্ষা-ব্যবস্থা এসব ব্যাপারে তোমরা কখনও নাক গলাতে এসো না, এগুলো তোমাদের ব্যপার নয়, কর্তব্যও নয়। তাদের কথাশুনে আপনার বাহিনী খুব খুশী হোয়ে আরও উৎসাহে কুচকাওয়াজ কোরতে লাগলো, আপনার বই দেখে দেখে উর্দী পড়তে থাকলো, বোতাম চকচকে পালিশ কোরতে থাকলো, বই মোতাবেক চুল, দাড়ি, গোঁফ ছাটতে থাকলো আর দিনে পাঁচ বার লাইন কোরে দাঁড়িয়ে আপনাকে স্যালুট কোরতে থাকলো।

এখন আপনি বলুন, এই বাহিনীকে আপনি আপনার বাহিনী বোলে স্বীকৃতি দেবেন, বা আপনার প্রিয় সেনাপতিই কি স্বীকৃতি দেবেন? নিঃসন্দেহে বলা যায়, অবশ্যই নয়। তা হোলে আল্লাহ(Allah) ও তার শেষ নবী (দঃ) বর্তমানের এই ‘মুসলিম(Muslim)’ জাতিকে তাদের জাতি বোলে স্বীকৃতি দেবেন না, একজন সম্রাট যেমন অমন উদ্দেশ্যবিহীন সেনাদলের অতি উৎকৃষ্ট কুচকাওয়াজের কোন দাম দেবেন না, তেমনি আল্লাহ(Allah)ও অমন উদ্দেশ্যহীন জাতির নামায, রোযার কোন দাম দেবেন না। তাই তার সেনাপতি (দঃ) ভবিষ্যতবাণী কোরে গেছেন যে, এমন একটা সময় আসবে যখন মানুষ রোযা রাখবে কিন্তু সেটা হবে না খেয়ে থাকা (রোযা হবেনা), এবং রাত্রে তাহাজ্জদ পড়বে কিন্তু সেটা হবে শুধু ঘুম নষ্ট করা (তাহাজ্জদ হবে না)। এখন সেই সময়।